ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। এটি এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্তভাবে মহান আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হয়। বিশেষ করে পবিত্র রমযান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত বেশি। কারণ এই সময়ের মধ্যেই রয়েছে মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাই ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ, গোনাহ মাফ এবং আত্মশুদ্ধির সুযোগ লাভ করে।
ইতিকাফ কী:
ইতিকাফ শব্দটি আরবি। যার অর্থ কোনো স্থানে অবস্থান করা বা নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মসজিদে অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকাকে ইতিকাফ বলা হয়। যে ব্যক্তি ইতিকাফ করে তাকে মু‘তাকিফ বলা হয়।
ইতিকাফের ফযিলত:
ইতিকাফ বান্দার আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার কোলাহল থেকে দূরে সরে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকে। এর ফলে অন্তরে তাকওয়া বৃদ্ধি পায়, গোনাহের জন্য তওবা করার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং লাইলাতুল কদর লাভের সুযোগ হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)। ইতিকাফ মূলত সেই রাতকে অন্বেষণ করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
ইতিকাফ কার জন্য:
ইতিকাফ মূলত মুসলিম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বৈধ। তবে শর্ত হলো, তা অবশ্যই মসজিদে হতে হবে এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণও তাঁর পরে ইতিকাফ করেছেন। আয়েশা (রা:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করতেন (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)।
ইতিকাফের প্রকার:
ইতিকাফ ৩ প্রকার। প্রথমত, সুন্নত ইতিকাফ। এটি হলো রমযানের শেষ দশ দিনের ইতিকাফ; যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত করতেন।
দ্বিতীয়, নফল ইতিকাফ। এটি রমজান ও রমজানের বাইরে বছরের যেকোনো সময় মসজিদে ইতিকাফ করা। এটাতে কোনো সময় নির্ধারিত নেই।
তৃতীয়ত, ওয়াজিব ইতিকাফ। কোনো ব্যক্তি যদি মানত করে যে, সে ইতিকাফ করবে, তবে সেই মানত পূরণ করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমন হযরত উমর (রা:) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি জাহেলী যুগে মসজিদুল হারামে এক রাত ইতিকাফ করার মানত করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমার মানত পূরণ কর”।
(সহীহ বুখারী)।
ইতিকাফ কোথায় করবে:
ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত যা আল্লাহর ঘরে অবস্থান করে তাঁর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা যখন মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ইতিকাফের মূল স্থান হলো মসজিদ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)।
ফিকহবিদদের মতে মসজিদের মর্যাদা ও ইবাদতের সুযোগ অনুযায়ী ইতিকাফের স্থানগুলোর মধ্যে কিছু স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো- বায়তুল্লাহ। অর্থাৎ কাবা শরিফ সংলগ্ন মসজিদে ইতিকাফ করা। এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মসজিদ এবং এখানে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়ত, মসজিদে নববীতে ইতিকাফ করা। এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ এবং মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান।
তৃতীয়ত, মসজিদুল আকসায় ইতিকাফ করা। ইসলামের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ এবং তিনটি মর্যাদাপূর্ণ মসজিদের একটি।
চতুর্থত, জুমা অনুষ্ঠিত হয় এমন জামে মসজিদে ইতিকাফ করা। এতে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য অন্যত্র যেতে হয় না।
পঞ্চমত, পাঁচ ওয়াক্ত জামাতের নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এমন পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফ করা। এখানে নিয়মিত জামাতে অংশগ্রহণ করা সহজ হয়।
আর নারীদের জন্য শরিয়তের বিধান কিছুটা ভিন্ন। অধিকাংশ ফকীহের মতে নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট নামাজের স্থান বা ইবাদতের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ইতিকাফ করতে পারেন। কারণ তাদের জন্য ঘরেই ইবাদত করা অধিক নিরাপদ ও উত্তম।
সুতরাং ইতিকাফের মূল স্থান হলো মসজিদ। আর যারা আল্লাহর ঘরে অবস্থান করে ইবাদতে মগ্ন হয়, তারা মহান রবের নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ পায়।
ইতিকাফে করণীয়:
ইতিকাফকারীকে অধিক সময় আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করতে হবে। বিশেষ করে কোরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত, যিকির, দোয়া এবং ইস্তিগফারে সময় ব্যয় করা উচিত। দুনিয়াবী আলাপ-আলোচনা, অপ্রয়োজনীয় কাজ ও সময় অপচয় থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় থাকাকালে স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)
ইতিকাফে বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করা, তাহাজ্জুদ নামাজ, সালাতুল হাজাত, কাযা নামাজসহ অন্যান্য নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, তাসবিহ-তাহলিল পড়া, দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর লাভের আশায় দীর্ঘ সময় ইবাদতে মশগুল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় বান্দা নিজের জীবনের ভুলত্রুটি নিয়ে চিন্তা করবে, আন্তরিকভাবে তওবা করবে এবং আল্লাহর রহমত কামনা করবে। এভাবেই ইতিকাফ মানুষের আত্মিক উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহামূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করে।
ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত যা মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। তাই লোক দেখানো বা দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে নয়, বরং একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ইতিকাফ করা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ইতিকাফ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক ও খতিব।
ই-মেইল: [email protected]
বিকেপি/এমএম

