প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রতি বছর ফিরে আসে পবিত্র মাহে রমজান। সিয়াম সাধনার এই মাসটি যখন তার শেষ দশকে এসে দাঁড়ায়, তখন মুমিনের হৃদয়ে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা জাগে। এই ব্যাকুলতা এক মহিমান্বিত রজনীকে কাছে পাওয়ার, যার নাম ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘মহিমান্বিত ভাগ্য রজনী’। এটি কেবল একটি রাত নয়, বরং আধ্যাত্মিক জাগরণ, আত্মশুদ্ধি এবং পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের এক মহিমান্বিত শুভক্ষণ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব:
লাইলাতুল কদরের অবতারণা ঘটেছিল সাহাবায়ে কেরামের এক আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা থেকে। ইবনে জারি বর্ণনা করেছেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বনি ইসরাইলের এক সাধক পুরুষের বিষয়ে সাহাবাদের মজলিশে আলোচনা করেছিলেন। তিনি সারা রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আর সকাল হতেই আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বেরিয়ে পড়তেন এবং সারা দিন জিহাদে কাটাতেন। এভাবে তিনি দীর্ঘ এক হাজার মাস কাটিয়ে দেন। এ ঘটনার পাশাপাশি পূর্বের নবী-রাসুল ও তাঁদের অনুসারীদের দীর্ঘ হায়াতি জীবনের ইবাদতের বিবরণ শুনে স্বল্প হায়াতের সাহাবায়ে কেরাম (রা.) খুবই আশ্চর্য হয়ে পড়েন এবং আফসোস করতে থাকেন। সাহাবায়ে কেরামদের (রা.) এই আফসোসের কারণে নবী করিম (সা.) নিজেও ব্যথিত হন। এ সময়ে আল্লাহ তাআলা সূরা কদর নাজিল করে জানিয়ে দেন, পূর্ববর্তী উম্মতের চাইতে শেষ জামানার স্বল্প হায়াতের মুমিনদের মর্যাদা কম নয় বরং আরও বেশি। এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উম্মতে মুহাম্মাদীর এক রাতের ইবাদতের মর্যাদা অনেক বেশি যদি তারা সেটা অর্জন করতে পারে।
কোরআনের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:
রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য মূলত আল-কোরআনের কারণে। আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে এই রাতেই কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনুল কারিমে বলেছেন, “রমজান মাসে কোরআন নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৮৫) আবার সূরাতুল কদরের প্রথম আয়াতেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “নিশ্চয় আমরা কোরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে।” এ আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, কোরআন পাক লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ হয়েছে। এর এক অর্থ এই যে, সমগ্র কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করা হয়েছে, অতঃপর জিবরাইল (আ.) একে ধীরে ধীরে তেইশ বছর ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছাতে থাকেন। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, এ রাতে কয়েকটি আয়াত অবতরণের মাধ্যমে কোরআন অবতরণের ধারাবাহিকতা সূচনা হয়ে যায়। এরপর অবশিষ্ট কোরআন পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পূর্ণ তেইশ বছরে নাযিল করা হয়। (আদওয়াউল বায়ান)
মুফাসসিরগণের মতে, কোরআনের সংস্পর্শে এসে একটি সাধারণ রাত যেমন হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তেমনি একজন সাধারণ মানুষ যদি এই রাতে এবং পূর্ণ হায়াতে জিন্দেগিতে কোরআনের আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করার শপথ নেয়, তবে তার জীবনের মানও সাধারণ থেকে অসাধারণে উন্নীত হবে আশা করা যায় ইনশাআল্লাহ।
ফেরেশতাদের আগমনের গূঢ় রহস্য:
সূরা কদরের চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিবরাঈল আ.) অবতীর্ণ হন।’’ জিবরাঈল (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কারণে সমস্ত ফেরেশতা থেকে আলাদা করে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সাথে অন্যান্য ফেরেশতারাও সে রাত্রিতে অবতরণ করেন। (ফাতহুল কাদির) হাদিসে আছে, “লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে পৃথিবীতে ফেরেশতারা এত বেশি অবতরণ করে যে, তাদের সংখ্যা পাথরকুচির চেয়েও বেশি।” (মুসনাদে আহমাদ: ২/৫১৯, মুসনাদে তায়ালাসী: ২৫৪৫)
মানুষ সৃষ্টির সময় ফেরেশতারা যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, আল্লাহ তাআলা কদরের রাতে ফেরেশতাদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে সেই সংশয়ের জবাব দেন। কোটি কোটি ফেরেশতা যখন দেখেন সারা বিশ্বের মুমিনরা আল্লাহর প্রেমে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে, তখন তাঁরা লজ্জিত হয়ে মুমিনদের জন্য শান্তি ও ক্ষমার দোয়া করতে থাকেন। এটি মূলত মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক আধ্যাত্মিক প্রদর্শনী।
ক্ষমার মনস্তাত্ত্বিক ও পরকালীন প্রভাব:
হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে কেউ ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদর রাত্রিতে সালাত আদায় করতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী: ১০৯১, মুসলিম: ৭৬০) এখানে ঈমান ও সওয়াবের আশা শব্দ দুটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল রাত জাগার নাম নয়, বরং বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা ও আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে নিজের জীবনকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া। এই ক্ষমা কেবল পরকালীন মুক্তি নয়, বরং ইহকালেও একজন মানুষকে পাপের গ্লানি থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে জীবন গড়ার মানসিক শক্তি জোগায়।
অনির্ধারিত রাতের রহস্য ও ইতিকাফ:
লাইলাতুল কদরকে নির্দিষ্ট কোনো রাতে প্রকাশ করার পেছনে গভীর প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে। এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে, নবী করিম (সা.) নির্ধারিত রাত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখেন যে, দুজন ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের রাত নিয়ে তর্ক করছিল। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর স্মৃতি থেকে সে বিষয়টি দূর করে দেন। এতে তিনি বলতে ভুলে যান। যেমন বিষয়টি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী করিম (সা.) আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলিম ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবত এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ করো।” (বুখারী: ২০২৩) পরবর্তীতে অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত তালাশ করো।” (বুখারী: ২০২০)
লাইলাতুল কদরকে খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ‘ইতিকাফ’। রমজানের শেষ দশ দিন জাগতিক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) নিজেকে সঁপে দেওয়াকেই ইতিকাফ বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফকারী মূলত দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর দুয়ারে পড়ে থাকেন। একজন ভিক্ষুক যেমন দাতার দুয়ারে ধৈর্য ধরে বসে থাকলে কিছু না কিছু পায়, তেমনি ইতিকাফকারী ব্যক্তি রমজানের শেষ দশকের সবগুলো বিজোড় রাত ইবাদতে কাটানোর সুযোগ পান। ফলে লাইলাতুল কদর তাঁর মিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
মহিমান্বিত শান্তিপূর্ণ রাত:
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরাতুল কদরের পাঁচ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।” এ রাত হবে দুনিয়ার বুকে সবচাইতে শুদ্ধতম, শান্তিময় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুক্ত রাত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকে নিরাপত্তার বিষয়টি এতটাই নিশ্চয়তাপূর্ণ যে এর চাইতে আর কোনো গ্যারান্টার নেই। কারণ এখানে গ্যারান্টি দিয়েছেন স্বয়ং মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ। সূরা কদরের শেষ আয়াতের এই অংশটি মূলত লাইলাতুল কদরের অনন্য মহিমা ও প্রশান্তিকে তুলে ধরে। এখানে সালাম বা শান্তি শব্দটি দিয়ে আল্লাহ তাআলা এই রাতের এমন এক নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও কল্যাণের কথা বুঝিয়েছেন যা সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে ফজর পর্যন্ত বলবৎ থাকে।
লাইলাতুল কদরের কিছু আলামত:
(১) রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।
(২) নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।
(৩) মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
(৪) সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।
(৫) কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।
(৬) ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
(৭) সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। (সহীহ ইবনু খুযাইমাহ: ২১৯০; বুখারী: ২০২১; মুসলিম: ৭৬২)
মোনাজাতের ভাষা ও আত্মসমর্পণ:
হাদিসে এসেছে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: যদি আমি শবে কদর পাই, কী দোয়া করব? উত্তরে তিনি বললেন: এই দোয়া করো, “হে আল্লাহ, আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। ক্ষমা আপনার পছন্দনীয়। অতএব আমার গুনাহসমূহ মার্জনা করুন।” (তিরমিযী: ৩৫১৩)
এই দোয়ায় ‘আফুউন’ শব্দটির ব্যবহার চমৎকার। এর অর্থ এমন ক্ষমা যা কেবল অপরাধ মুছে দেয় না, বরং অপরাধের চিহ্নটুকুও মুছে ফেলে। অর্থাৎ কদরের রাতে ক্ষমা পাওয়ার অর্থ হলো আল্লাহর খাতায় বান্দার কোনো পাপিষ্ঠ চিহ্ন আর অবশিষ্ট থাকে না। পাশাপাশি এটা যেহেতু ভাগ্য রজনী; ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়, সেহেতু আপনার জীবনের হালাল যা চাওয়া-পাওয়া আছে সবকিছুই দোয়ার মাধ্যমে প্রার্থনা করতে হবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাহী দরবারে।
শবে কদরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল:
বেশি বেশি দান সদকা করা, নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, সালাতুল হাজত, নামাজে কিরাত ও রুকু-সিজদা দীর্ঘ করা, কোরআন শরিফের ফজিলতের সূরাসমূহ তিলাওয়াত করা, দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়া, তওবা-ইস্তিগফার অধিক পরিমাণে পাঠ করা, দোয়া-কালাম, তাসবিহ-তাহলিল পাঠ ইত্যাদি করা; এর পাশাপাশি কবর জিয়ারত করা, নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মুমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনায় দোয়া করা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সালনা, গাজীপুর, ঢাকা
বিকেপি/এমএম

