ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, কোনো স্থানে কিংবা কোনো গৃহে অবস্থান করা। আর শরিয়তের পরিভাষায় আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুনিয়ার সংশ্রব, বন্ধন, সম্বন্ধ ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল আল্লাহর জন্য মসজিদে অবস্থান করে ইবাদত করাকে ইতিকাফ বলে।
ইতিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
জাগতিক সমস্ত কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়ে একজন মানুষ কেবলই আল্লাহর উপাসনায় মগ্ন থাকেন। কোন ধরনের গুনাহ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। মুক্ত থাকেন তিনি অশ্লীল ও ফাহেশাপূর্ণ কথাবার্তা থেকে। তার চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও ভাবনাগ্রস্ত শুধুই মহান রাব্বুল আলামিনকে ঘিরে। তাই অতিদ্রুত তার সঙ্গে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হতে থাকে। আল্লাহ তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন, ইতিকাফকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে বাইরে থেকে সকল নেক কাজ করে, গুনাহ হতে বেঁচে থাকে তার জন্য নেকী লেখা হয়। (মিশকাত: ২১০৮) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রিয়নবী (সা.) রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন।’ (মুসলিম: ২৬৫১)।
ইতিকাফের প্রকারভেদ
সুন্নত ইতিকাফ : রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার যে কোনো একজন ইতিকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ইতিকাফ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মহল্লার একজন ব্যক্তিও যদি ইতিকাফ না করে তবে মহল্লার সবার সুন্নত পরিত্যাগের গোনাহ হবে। (দুররে মুখতার: ২/৪৪০)। ২১ তারিখের রাত থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এই ইতিকাফের সময়। কারণ রাসুল (সা.) প্রত্যেক বছর এই দিনগুলোতেই ইতিকাফ করতেন। এ কারণে এটাকে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়।
ওয়াজিব ইতিকাফ : মান্নতের ইতিকাফ ওয়াজিব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা যেন তাদের মানৎ পূর্ণ করে।’ (সূরা হজ: ২৯) তাতে কোনো শর্ত থাকুক বা না থাকুক। যেমন- কেউ বললো, ‘আমার এই কাজ সমাধা হলে আমি ইতিকাফ করবো’, এতে যেমন ইতিকাফ ওয়াজিব হবে ঠিক তেমনই কেউ যদি বলে- ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইতিকাফ করবো’, এ অবস্থাতেও ইতিকাফ করা ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২১৩, দুররে মুখতার: ২/৪৪১) সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে তা কাজা করা ওয়াজিব।
নফল ইতিকাফ : উপরোক্ত দুই প্রকার ইতিকাফ ছাড়া বাকি সব ইতিকাফ নফল। এ ইতিকাফ মানুষ যেকোনো সময় করতে পারে। অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যতক্ষণ চায় করতে পারে। রোজারও প্রয়োজন নেই।
ইতিকাফের শর্ত
মুসলমান হওয়া, পাগল না হওয়া, বালেগ হওয়া, নিয়ত করা, ফরজ গোসলসহ হায়েজ নেফাছ থেকে পবিত্র হওয়া, রোজা রাখা। মসজিদে ইতিকাফ করা। ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মতে জামে মসজিদে ইতিকাফ করা উত্তম। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মতে যে মসজিদে জামাআত সহকারে সালাত হয় না, সে মসজিদে ইতিকাফ জায়েজ নেই।
ইতিকাফের বিধান
রমজানে ইতিকাফকারীদের ২০ রমজানের সূর্যাস্তের আগে মসজিদের সীমানায় প্রবেশ করতে হবে। শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া। অর্থাৎ মহল্লার যেকোনো একজন ইতিকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ইতিকাফ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মহল্লার একজন ব্যক্তিও যদি ইতিকাফ না করে তবে মহল্লার সবার সুন্নাত পরিত্যাগের গোনাহ হবে।
ইতিকাফকারীর জন্যে মসজিদের সীমানা
অনেক লোক মসজিদের সীমানা সম্পর্কে অবগত নন। এ কারণে অনেকে ইতিকাফ নষ্ট করে থাকেন। সাধারণত মসজিদের পুরো বাউন্ডারিকেই মসজিদ বলে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে মসজিদ শুধু ওই স্থানকে বলা হয়, যে স্থানকে শুধু নামাজ আদায়ের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। এছাড়া ওযুর-ইস্তিঞ্জার স্থান, হাম্মাম, গোসলখানা, ইমাম সাহেবের হুজরা ইত্যাদি। এগুলো মসজিদের হুকুমের বাইরে। ইতিকাফকারী শরিয়তস্বীকৃত প্রয়োজন ব্যতিরেকে এসব স্থানে গেলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান
ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া তিন ধরনের হতে পারে। এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাবের জন্য, খাওয়া-দাওয়ার জন্য, পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তবে শর্ত হল এ সকল বিষয় যদি মসজিদের গণ্ডির মাঝে সেরে নেয়া যায় তবে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। দুই. এমন সকল নেক আমল বা ইবাদত-বন্দেগির জন্য বের হওয়া যাবে না যা তার জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা, জানাজাতে অংশ নেয়া ইত্যাদি। তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না, যা ইতিকাফের বিরোধী। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। ইতিকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যায়।
যে কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয় :
মসজিদ বা নারীদের ইতিকাফ স্থান থেকে বিনাপ্রয়োজনে বের হলে। ইসলাম ত্যাগ করলে। অজ্ঞান, পাগল বা মাতাল হলে। নিয়মিত ঋতুস্রাব দেখা দিলে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে বা গর্ভপাত হলে। সহবাস করলে। বীর্যপাত ঘটলে কিন্তু স্বপ্নদোষ হলে হবে না। ইতিকাফকারীকে জোরপূর্বক মসজিদ বা ইতিকাফের স্থান থেকে বের করে দিলে। শরিয়ত অনুমোদিত কোনো কাজে বাইরে গেলে যদি কেউ আটকে রাখে বা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে ফলে ইতিকাফ স্থানে যেতে দেরি হয় তবে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
মহিলাদের ইতিকাফ
নারীরাও ঘরে কোনো স্থান নির্দিষ্ট করে ইতিকাফ করতে পারে। তবে তার জন্য স্বামীর অনুমতি আবশ্যক। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হায়েজ ও নেফাস থেকে পাক থাকতে হবে। তারা ঘরে নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানে ইতিকাফ করবেন। এটা মহিলাদের জন্য মসজিদের মতো। অর্থাৎ পানাহার, নিদ্রা সে জায়গায়ই করতে হবে।
যদি শারীরিক বা শরয়ি কোনো প্রয়োজন না হয় তবে অত্র স্থান ত্যাগ করলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। যদি ঘরে শুরু থেকেই নামাজের স্থান নির্দিষ্ট থাকে তাহলে সেখানেই ইতিকাফ করবে। সেখান থেকে সরে অন্যত্র ইতিকাফে বসা জায়েয নেই। যদি আগে থেকে নামাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারিত না থাকে তবে ইতিকাফের সময় স্থান নির্ধারিত করে নেবে এবং সেখানে ইতিকাফ করবে। ঘর ছেড়ে মসজিদে ইতিকাফ করা মহিলাদের জন্য মাকরুহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২১১)।
লেখক: ইমাম,শ্যামপুর কদমতলী রাজউক তাকওয়া জামে মসজিদ ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
বিকেপি/এমএম

