Logo

ধর্ম

আত্মশুদ্ধি ও নবজীবনের মহিমান্বিত রজনী

Icon

আমানুর রহমান

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ২১:৫৩

আত্মশুদ্ধি ও নবজীবনের মহিমান্বিত রজনী

পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায় এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মহিমান্বিত রজনী ‘লাইলাতুল কদর’। ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাস বা প্রায় তিরাশি বছরের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। একজন মানুষের গড় আয়ুর চেয়েও দীর্ঘ এই পুণ্যময় সময়সীমা মূলত স্রষ্টার এক অসীম অনুগ্রহ, যার মাধ্যমে সীমিত আয়ুর মানুষও বিপুল পুণ্যের অধিকারী হতে পারে। তবে কদরের রাতের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল গাণিতিক হিসাবের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা অত্যন্ত গভীর, বাস্তবমুখী এবং মানবজীবনের জন্য যুগান্তকারী। এই রাতটি মূলত আত্মিক পুনর্জন্ম এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক নবায়নের এক অনন্য সুযোগ। এটি আমাদের শেখায় যে, আন্তরিক অনুশোচনা ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে জীবনের যেকোনো মুহূর্তে অতীতের গ্লানি মুছে ফেলে শুদ্ধতার পথে ফিরে আসা সম্ভব।

লাইলাতুল কদরের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হলো, এই রাতেই মানবজাতির মুক্তির সনদ পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়। কোরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় যাত্রার এক সুস্পষ্ট নির্দেশিকা ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। তাই কদরের রাতের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো নিজেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের রাত নয়, বরং জীবনের উদ্দেশ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময়। স্রষ্টার বাণীকে কেবল ভক্তিভরে পাঠ করাই যথেষ্ট নয়; এর অর্থ অনুধাবন করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সমাজজীবনে তার সফল প্রয়োগ ঘটানোই হলো এর মূল উদ্দেশ্য। এই মহিমান্বিত রজনীর আরেকটি অপরিহার্য শিক্ষা হলো বিনয় ও ক্ষমার সংস্কৃতি নিজের জীবনে ধারণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতের জন্য একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন, যেখানে স্রষ্টার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে। এই প্রার্থনা মানুষের যাবতীয় অহংকার চূর্ণ করে স্রষ্টার কাছে নিজের চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে শেখায়। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কদরের রাত আমাদের শেখায় কীভাবে ক্ষমার মাধ্যমে একটি নিষ্কলুষ জীবন শুরু করা যায়। এটি হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে প্রবল আশার সঞ্চার করে, কারণ স্রষ্টার অসীম দয়া মানুষের সব পাপের চেয়ে অনেক বড়। একইসঙ্গে, স্রষ্টার কাছে ক্ষমা পেতে হলে আমাদের নিজেদেরও অন্য মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল ও সহনশীল হতে হবে- এই শিক্ষাও রাতটি আমাদের দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই রাত মানুষকে চূড়ান্ত হতাশা ও অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দেয় এবং অতীতের সব কালিমা মুছে ফেলে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। স্রষ্টা মানুষের ভুলের চেয়ে তার অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসাকে বেশি মূল্যায়ন করেন। এই ক্ষমাশীলতার মহান শিক্ষা ধারণ করে আমাদেরও উচিত অন্যের ভুলগুলো ক্ষমা করা এবং পারস্পরিক বিদ্বেষ ভুলে একটি সহনশীল সমাজ গঠন করা।

‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান এবং ভাগ্য বা তাকদির নির্ধারণ। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা হলো, জীবন কোনো অপরিবর্তনীয় ছক নয়। ঐকান্তিক প্রার্থনা ও সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষ তার ভবিষ্যৎকে সুন্দরভাবে রূপদান করতে পারে। এই রাত আমাদের নিষ্ক্রিয় না হয়ে উদ্যোগী হতে শেখায় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভবিষ্যৎ বর্তমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও নিখাদ প্রার্থনার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

সূরা কদরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, এই রাতে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে। লাইলাতুল কদর কেবল রাত জাগরণ নয়, এটি আত্মোপলব্ধি, জাগতিক মোহমুক্তি এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক মহোৎসব। এই রাতের চূড়ান্ত শিক্ষা হলো হিংসা, বিদ্বেষ ও লোভ ত্যাগ করে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হওয়া। সত্যিকারের ইবাদত মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস থেকে বের করে সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমেই প্রকৃত অর্থে এই শান্তির রাতের হক আদায় করা সম্ভব। কদরের রাতে যে ঐশী শান্তির ধারা নেমে আসে, তাকে নিজের মনন ও সমাজজীবনে চিরস্থায়ীভাবে ধারণ করতে পারাই হলো এই মহিমান্বিত রজনীর প্রকৃত সার্থকতা।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট,পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ-১৪০০

ই-মেইল: [email protected]

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর