Logo

ধর্ম

চাকচিক্যময় দুনিয়ায় নীরব মুসাফির

Icon

শাহরিয়ার হোসাইন

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ২২:১৮

চাকচিক্যময় দুনিয়ায় নীরব মুসাফির

আজকের পৃথিবী দৃশ্যমান সাফল্যের পূজারি। চারদিকে সাফল্যের বিজ্ঞাপন, ভোগের আহ্বান, প্রতিযোগিতার উত্তাপ- সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অবিরাম প্রদর্শনী। এই চাকচিক্যময় দুনিয়ায় একজন মুমিনের অবস্থান কী? ইসলামি দর্শনের আলোকে বলা যায়, মুমিন এ দুনিয়ার বাসিন্দা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন নীরব মুসাফির- অস্থায়ী যাত্রী।

দুনিয়া: ক্ষণস্থায়ী এক সরাইখানা

ইসলামে দুনিয়াকে চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি আখিরাতের পথে একটি সাময়িক বিরতি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআন-এ ইঙ্গিত করেছেন যে পার্থিব জীবন খেল-তামাশা ও সাময়িক ভোগের বস্তু মাত্র। এই উপলব্ধি মুমিনের অন্তরে এক ধরনের সংযম ও সচেতনতা সৃষ্টি করে। তিনি জানেন, এই দুনিয়ার সৌন্দর্য, সম্পদ, ক্ষমতা- সবই একদিন ফুরিয়ে যাবে।

যেমন পথিক কোনো সরাইখানায় অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় নেয়, তেমনি মুমিন দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন, কিন্তু এতে আসক্ত হয়ে পড়েন না। তাঁর হৃদয় বাঁধা থাকে চিরস্থায়ী আবাস আখিরাতের সাথে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন “ মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট উচ্চ মর্যাদাসমূহ এবং ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। ( আনফাল ২-৪)”

নীরবতার দর্শন: অন্তর্গত শক্তির প্রকাশ

মুমিনের নীরবতা দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং এটি আত্মসংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয়। ইসলামি নৈতিকতায় ধৈর্য (সবর), কৃতজ্ঞতা (শুকর) এবং আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “রহমানের বান্দা তারাই যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে আর অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে সম্বোধন করলে তারা বলে- ‘শান্তি’, (আমরা বিতর্কে লিপ্ত হতে চায় না)।” সূরা ফুরকান ৬৩

রাসুলুল্লাহ সা. শিখিয়েছেন- যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখে, সে-ই প্রকৃত সফল। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে। (বুখারী ৬০১৮, মুসলিম ১৮২)।

মুমিন দুনিয়ার কোলাহলে হারিয়ে যান না; বরং অন্তরের প্রশান্তিকে অগ্রাধিকার দেন। এই নীরবতা তাকে আত্মসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করে, অন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং অহংকার থেকে মুক্ত করে। দুনিয়ার চাকচিক্য যখন মানুষকে প্রতিযোগিতা ও হিংসায় নিমজ্জিত করে, তখন মুমিন নীরবে নিজেকে প্রশ্ন করেন- “আমার রব কি আমার প্রতি সন্তুষ্ট?”

দায়িত্ব ও সংযমের সমন্বয়

মুমিন দুনিয়া ত্যাগী নন; বরং তিনি দায়িত্বশীল। ইসলাম দুনিয়াকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে বলে না, বরং তা ন্যায় ও নীতির আলোকে ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন “হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও এবং পান কর। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবেনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেননা। (সূরা আরাফ:৩১)”

উপার্জন, শিক্ষা, সমাজসেবা- সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। এখানে মুমিনের ভূমিকা এক আলোকবর্তিকার মতো। তিনি প্রতারণার ভিড়ে সততার উদাহরণ, ভোগবাদের মাঝেও সংযমের প্রতীক। তাঁর নীরবতা অহংকারহীনতার ভাষা, তাঁর কাজই তাঁর পরিচয়।

মুমিনের হৃদয়

দুনিয়ার ভিড়ে মানুষের অভাব নেই; অভাব আলোকিত হৃদয়ের। মুমিনের হৃদয় সেই বিরল আলোর আধার- যেখানে ভয় আছে, তবে তা মানুষের নয়; ভালোবাসা আছে, তবে তা কেবল স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য। তার অন্তর দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহাবিষ্ট হয় না; বরং আল্লাহর স্মরণে নরম হয়ে আসে।

কোরআন ঘোষণা করে: “নিশ্চয়ই মুমিনরা তো তারাই, যখন আল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়, তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে”( সূরা আল-আনফাল ২)

এই কেঁপে ওঠা দুর্বলতা নয়; এটি জীবন্ত ঈমানের স্পন্দন। যে হৃদয় যিকিরে সাড়া দেয়, সেটিই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হৃদয়। আর যে অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি খুঁজে পায়, সে কখনও দুনিয়ার অস্থিরতায় ভেঙে পড়ে না। নির্ঝুম গভীর রাতে, যখন চারিদিক নিস্তব্ধতার চাদরে আচ্ছাদিত-তখন মুমিনের হৃদয় জেগে ওঠে। মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু তার অন্তর জেগে থাকে রবের স্মরণে। সে সিজদায় অবনত হয়ে নীরবে তার রবের কাছে মাথা ঠেকায়, অশ্রু বিসর্জন দেয় একান্ত প্রার্থনায়।

এই রাতের সিজদা কোনো প্রদর্শন নয়; এটি ভালোবাসার ভাষা, বিনয়ের স্বাক্ষর। দুনিয়ার কোলাহলে যে হৃদয় স্থির থাকে, সে-ই গভীর রাতে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে রবের দরবারে।

কোরআনে বলা হয়েছে, তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিয্ক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। (সূরা আস-সাজদাহ ১৬)

নির্ঝুম রাতের সেই অশ্রু-পরাজয়ের নয়, বরং আত্মসমর্পণের। সেই সিজদাই মুমিনের শক্তি, সেই অশ্রুই তার হৃদয়ের পবিত্রতা।“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা আর-রাদ২৮) এই প্রশান্তি বাহ্যিক সাফল্যের ফল নয়; এটি আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে; তা ভালো হলে পুরো শরীর ভালো হয়, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়। জেনে রাখো, সেটি হলো হৃদয়।”( সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

অতএব, মুমিনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে নয়; নিজের হৃদয়ের ভেতরের অহংকার, হিংসা ও কপটতার বিরুদ্ধে। সে চায় তার অন্তর হোক স্বচ্ছ, নির্মল ও বিনয়ী। মুমিনের হৃদয় দয়ার উৎস। সে অন্যের কষ্টে ব্যথিত হয়, অন্যের সুখে ঈর্ষান্বিত নয়; বরং আনন্দিত। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “সমস্ত মুসলিম এক ব্যক্তির মত। যদি তার চক্ষু পীড়িত হয় তবে তার সমগ্র দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। যদি তার মাথা অসুস্থ হয় তাহলে সমগ্র শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে।” (মুসলিম ৬৩৫৩)

এই হৃদয় দুনিয়ায় বাস করে, কিন্তু দুনিয়ার দাস নয়। আখিরাতমুখী এই অন্তর তাওয়াক্কুলে দৃঢ়, সংযমে সুন্দর। এমন হৃদয়ই পারে অন্ধকার সময়েও আলোর দিশা হতে—নীরবে, গভীরভাবে, স্থির বিশ্বাসে।

আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি

মুমিন জানেন, প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার করতালিতে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। তাই তিনি বিপদে ভেঙে পড়েন না, সাফল্যে অহংকারে ডুবে যান না। তাঁর দৃষ্টি থাকে চূড়ান্ত জবাবদিহির দিনের দিকে। এই চেতনা তাকে অন্যায় প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করে, হতাশা থেকে মুক্তি দেয় এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সহায়তা করে। তিনি বুঝতে পারেন- দুনিয়ার আলো ক্ষণিকের, কিন্তু ঈমানের আলো চিরন্তন। আধুনিক ভোগবাদ মানুষের চাহিদাকে প্রয়োজন থেকে আকাঙ্ক্ষায়, আর আকাঙ্ক্ষাকে আসক্তিতে রূপান্তর করেছে। কিন্তু মুমিন জানেন- যা ক্ষণস্থায়ী, তা দিয়ে চিরস্থায়ী পরিতৃপ্তি সম্ভব নয়। তাই তিনি দুনিয়াকে ব্যবহার করেন, কিন্তু দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হন না।

যুহুদ ও তাজাম্মুল: মুমিনের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবোধ

বর্তমান বস্তুবাদী সমাজে সফলতার সংজ্ঞা কেবল বাহ্যিক জাঁকজমক আর অর্থকড়িতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে একজন মুমিনের কাছে প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, যা অর্জিত হয় ‘যুহুদ’ ও ‘তাজাম্মুল’-এর এক অনন্য ভারসাম্যে। ‘যুহুদ’ বা দুনিয়াবিমুখতা মানে এই নয় যে, মুমিন তালি দেওয়া কাপড় পরবে বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বরং প্রকৃত যুহুদ হলো অন্তরের সেই অবস্থা, যেখানে দুনিয়ার মায়া বা সম্পদের মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন যুহুদ অবলম্বনকারীদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, অথচ তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরতে পছন্দ করতেন। এখানেই ‘তাজাম্মুল’ বা পরিপাটি থাকার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়, যা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। একজন মুমিন যখন জুমার দিন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেকে মার্জিতভাবে উপস্থাপন করেন, তখন তা ইসলামের সৌন্দর্যকেই ফুটিয়ে তোলে। এই জীবনবোধ তাকে বিপদে ধৈর্যশীল হতে শেখায় এবং সাফল্যে অহংকার থেকে মুক্ত রাখে। তাঁর দৃষ্টি থাকে চূড়ান্ত জবাবদিহির দিনের দিকে, তাই দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। তিনি সম্পদ উপার্জন করেন কিন্তু তাকে অন্তরে স্থান দেন না, বরং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে আত্মিক প্রশান্তি খোঁজেন। পরিশেষে, যুহুদ ও তাজাম্মুল মুমিনের এমন এক সম্ভার যা তাকে ভেতর থেকে সমৃদ্ধ এবং বাইরে থেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এই মধ্যমপন্থা অনুসরণের মাধ্যমেই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রকৃত শান্তি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

চাকচিক্যময় দুনিয়ায় মুমিন সত্যিই এক নীরব মুসাফির। তিনি কোলাহলের মাঝে প্রশান্ত, ভোগের আহ্বানে সংযত, প্রতিযোগিতার উত্তাপে স্থির। তাঁর যাত্রা দুনিয়ার সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের অনন্ত প্রান্তরে বিস্তৃত। এই দর্শন মানুষকে ভোগবাদী উন্মাদনা থেকে মুক্ত করে আত্মিক উৎকর্ষের পথে আহ্বান জানায়। তাই আমাদের উচিত দুনিয়ার চাকচিক্যের মাঝে হারিয়ে না গিয়ে, নীরব মুসাফিরের মতো সচেতন, সংযমী ও আল্লাহমুখী জীবন গড়ে তোলা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর