মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে সিক্ত থাকে। এ মাস মুমিনের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের বসন্তকাল। বিশেষত রমজানের শেষ দশক অত্যাধিক মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই দশকেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ লাইলাতুল কদর। এই মহিমান্বিত সময়কে যথাযথভাবে ধারণ করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো ইতিকাফ। এটি এমন এক ইবাদত, যা মানুষকে জাগতিক কোলাহল থেকে সরিয়ে এনে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিবিষ্ট করে।
ইতিকাফের পরিচয়: ইতিকাফ শব্দের অর্থ অবস্থান করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়াবি ব্যস্ততা পরিহার করে মসজিদে অবস্থান করা এবং ইবাদতে নিমগ্ন থাকাকে পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়। মহানবী (সা.) জীবনের প্রতিটি রমজানেই শেষ দশকের ইতিকাফ করেছেন। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক রমজানে শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৪৪)
নবীজির ইন্তিকালের পর উম্মুল মুমিনিনগণও নিজেদের ঘরে ইতিকাফ করেছেন। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমৃত্যু রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৬) নবীজি (সা.) উম্মতকেও শেষ দশকের ইতিকাফ করতে আদেশ করেছেন। ফলে সাহাবায়ে কেরাম এ আমলকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছেন। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৭)
ইতিকাফের বিধান: ফিকহের দৃষ্টিতে রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ সুন্নতে মুআক্কাদা কিফায়া। অর্থাৎ একটি মসজিদে কোনো একজন ইতিকাফ পালন করলে মসজিদের আশপড়শি সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে, আর কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
ইতিকাফকারীকে রমজানের বিশতম দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে এবং ইদের চাঁদ দেখার পর বা ত্রিশ রমজান পূর্ণ হলে মসজিদ ত্যাগ করতে হবে। ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস, রোজা পরিত্যাগ করা, অহেতুক কথাবার্তা বলা এবং অজু, ইসতিঞ্জা ও ফরজ গোসলের প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মাধ্যম: ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য নিজেকে আল্লাহমুখী করা। সাধারণ জীবনে মানুষ নিজের সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য, দায়িত্ব, কর্তব্য ও নানা চিন্তায় নিমগ্ন থাকে। ইতিকাফ তাকে সাময়িকভাবে সমস্ত ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে নিয়ে আসে। এসময় ইতিকাফকারী ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া, নফল নামাজ প্রভৃতিতে নিজেকে নিমগ্ন রাখে। ফলে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, তাকওয়া বৃদ্ধি পায় এবং মহান রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়।
ইতিকাফের ফজিলত: ইতিকাফকারীর জন্য হাদিস শরিফে অনেক সুসংবাদ ও ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
ইতিকাফের বিনিময় জান্নাত: হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মসজিদ হলো প্রত্যেক মুত্তাকির (খোদাভীরু ব্যক্তির) ঘর। আর যার ঘর মসজিদ, আল্লাহ তাআলা তার জন্য প্রশান্তি, রহমত বর্ষণ এবং নিরাপদে পুলসিরাত পার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা জান্নাতে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিয়েছেন।’ (সহিহুত তারগিব, হাদিস: ৩৩০)
দুটি হজের সওয়াব: হজরত হোসাইন ইবনে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে যে ব্যক্তি ইতিকাফ করবে, সে দুটি হজ অথবা ওমরার সওয়াব পাবে।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস: ৩৯৬৬)
গুনাহ মাফের ঘোষণা: হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় ইতিকাফ করবে, তার পেছনের সমস্ত (ছগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (জামে ছগির, হাদিস: ১২২৩০)
জাহান্নাম থেকে মুক্তি: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন, প্রত্যেক পরিখার দূরত্ব হবে দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৭৩২৬) একদিনের ইতিকাফের ফজিলত যদি এমন হয়, তাহলে পুরো দশদিনের ইতিকাফ কত মহান ফজিলতের, তা সহজেই অনুমেয়।
রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ নিঃসন্দেহে মহামূল্যবান ইবাদত। এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও বরকত লাভের মূল্যবান সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও যদি আমরা অন্তত এ দশকটুকু আল্লাহ তাআলার ঘর মসজিদে কাটানোর দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি, তবে তা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে ইতিকাফ পালনের তওফিক দান করুন এবং লাইলাতুল কদরের অগণিত রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত না করুন। আমিন।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

