মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের দোয়া সবচেয়ে বেশি কবুল করেন। রোজাদারের দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়, এ কথা হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে দোয়া কবুলের জন্য রয়েছে কিছু আদব ও শিষ্টাচার, যা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি এমন কিছু কাজ ও অভ্যাস আছে, যা দোয়া কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই একজন মুমিনের উচিত রমজানের বরকতময় সময়গুলো কাজে লাগিয়ে যথাযথ আদবের সঙ্গে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা এবং দোয়া কবুলের পথে বাধাস্বরূপ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা।
মুমিনের শক্তিশালী হাতিয়ার: দোয়া হলো সমস্ত ইবাদতের মূল। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘সমস্ত ইবাদতের মগজ বা মূল হলো দোয়া।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৩১৯৬) অন্য হাদিসে দোয়াকে মুমিনের হাতিয়ার বলা হয়েছে। হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দোয়া মুমিনের হাতিয়ার, দ্বিনের খুঁটি এবং আসমান ও জমিনের আলো।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ১৮৩৬)
সবচেয়ে সম্মানিত ইবাদত: আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া সবচেয়ে সম্মানিত ইবাদত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘(জিকির বা ইবাদতসমূহের মধ্যে) আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে সম্মানিত আর কিছুই নেই।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭০) দোয়া যেহেতু সম্মানিত ইবাদত, তাই দোয়া করতে হবে উত্তম ধারণা নিয়ে। আল্লাহ তাআলা বান্দার সঙ্গে তার ধারণা অনুযায়ী আচরণ করেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার সঙ্গে ঠিক তেমন আচরণই করি। আর সে যখন আমার নিকট দোয়া করে, আমি তখন তার সঙ্গে থাকি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৫)
দোয়ার ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা: পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দোয়া কবুল করার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমার নিকট দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ৬০) অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও আমি তো খুবই নিকটবর্তী। আমি দোয়াকারীর দোয়া কবুল করি যখন সে আমার নিকট দোয়া করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬) এই আয়াতটি রমজানের আয়াতসমূহের মধ্যেই বর্ণিত হয়েছে, যা এ মাসে দোয়ার বিশেষ গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত বহন করে। হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব ও সম্মানিত। বান্দা তাঁর কাছে দুই হাত তুললে তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৮৭৬)
দোয়ার আদবসমূহ: দোয়া করার সময় আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখলে সেই দোয়া আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে বেশি কবুল হয়। দোয়ার এমন কয়েকটি আদব হলো; এক. দোয়ার শুরু ও শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা। দুই. দোয়ার আগে ও পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরুদ পড়া। তিন. যে সময়গুলোতে দোয়া কবুলের সুসংবাদ রয়েছে, সেসময় দোয়া করা। চার. কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা। পাঁচ. অজু অবস্থায় দোয়া করা। ছয়. দুই হাত তুলে দোয়া করা। সাত. কায়মনোবাক্যে দোয়া করা।
দোয়া কবুলের সর্বোত্তম সময়: রমজানে দোয়া কবুলের অনেক বিশেষ সময় রয়েছে। যে সময়গুলোর পাবন্দি করে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলার দরবারে তা বেশি কবুল হয়। দোয়ার একটি আদব হলো এমন সময় দোয়া করা, যখন তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে সুসংবাদ রয়েছে।
রমজানে দোয়া কবুলের এমন বিশেষ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো-
ইফতারের সময়: ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কখনোই প্রত্যাখ্যাত হয় না।’ (সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস: ১৭৫৩) সারাদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করে যখন একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালন করেন, তখন ইফতারের মুহূর্তে তাঁর হৃদয় হয় অত্যন্ত বিনয়ী ও আন্তরিক। এই সময়ে করা দোয়া তাই আল্লাহ তাআলার দরবারে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
তাহাজ্জুদের সময়: রমজানের রাতগুলোও দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষত শেষ দশকের রাতগুলোতে। গভীর রাতের নির্জন মুহূর্তে আন্তরিকভাবে করা দোয়া মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম করে। রমজানে আমরা শেষরাতে সাহরি খাই। এটি তাহাজ্জুদের সময়। এসময় দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রমজানে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে দোয়া করা আমাদের জন্য অনেক সহজ।
শবে কদর: রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শবে কদর। এই মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর রহমত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। মহানবী (সা.) এই রাতে একটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। দোয়াটি হলো- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।’ দোয়াটির অর্থ হলো- ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩) এ ছাড়াও রমজানে সাহরির সময়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর, কোরআন তিলাওয়াতের পর এবং ইতিকাফ অবস্থায় করা দোয়াও কবুল করা হয়।
দোয়া কবুলের প্রতিবন্ধকতা: দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক কিছু পাপাচারে লিপ্ত থাকার কারণে অনেক সময় আমাদের দোয়া কবুল হয় না। দোয়া কবুলের পথে বাধা এমন কিছু বিষয় হলো; এক. ফরজ ও ওয়াজিব বিধান লঙ্ঘন করা। দুই. হারাম ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত থাকা। তিন. হারাম পথে উপার্জিত খাবার খাওয়া এবং হারাম টাকায় ক্রয়কৃত পোশাক পরিধান করা। চার. শিরক ও বিদআতের মতো গর্হিত অপরাধে লিপ্ত থাকা। পাঁচ. গাফেল ও উদাস মন নিয়ে দোয়া করা। ছয়. সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বাধা প্রদান না করা।
রমজান আমাদের জন্য দোয়া কবুলের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে এসেছে। আমরা চাইলেই এ মাসে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। আমাদের তাই রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনায় আল্লাহ তাআলার দরবারে হাত তোলা, নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং মানবতার কল্যাণ কামনা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। যদি আমরা আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সঙ্গে দোয়া করি, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা কবুল করবেন। এজন্য রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা আমাদের সবার কর্তব্য।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

