Logo

ধর্ম

হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:৫৪

হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক অনন্য সময়। এই মাসে রোজা, নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযম ও তাকওয়ার শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু রমজানের শেষ দশকের মধ্যে এমন একটি রাত রয়েছে, যার মর্যাদা ও ফজিলত অন্য সব রাতের তুলনায় অসীম। সেই মহিমান্বিত রাত হলো লাইলাতুল কদর।

ইসলামের দৃষ্টিতে লাইলাতুল কদর এমন এক বরকতময় রাত, যার ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এই রাতের মর্যাদা তুলে ধরতে একটি পূর্ণ সূরা নাজিল করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।”

(সূরা আল-কদর: ৯৭:১-৩) এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, এই রাতের গুরুত্ব কত মহান। একটি মাত্র রাতের ইবাদত প্রায় তিরাশি বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব এনে দিতে পারে। তাই প্রত্যেক মুমিন মুসলমান রমজানের শেষ দশকে এই রাত পাওয়ার আশায় বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী হয়।

লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতেই মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ জীবনবিধান পবিত্র কোরআন নাজিল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে।”

(সূরা আদ-দুখান:৩) এ রাতের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এই রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং মানুষের জন্য রহমত ও শান্তির বার্তা নিয়ে আসেন। কোরআনে বলা হয়েছে- সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে প্রত্যেক কাজে অবতীর্ণ হন। শান্তিময় সে রাত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।”

(সূরা আল-কদর: ৪-৫) অর্থাৎ লাইলাতুল কদর হলো শান্তি, বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ এক মহিমান্বিত রজনী।

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ

লাইলাতুল কদরের সুনির্দিষ্ট তারিখ আল্লাহ তাআলা গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই ইবাদতে মনোযোগী হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারি: ২০১৭; সহিহ মুসলিম: ১১৬৯) এ কারণে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লাইলাতুল কদরের ফজিলত

এই রাতের সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো- আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করলে মানুষের পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।-(সহিহ বুখারি: ১৯০১; সহিহ মুসলিম: ৭৬০) এই হাদিস প্রমাণ করে যে, লাইলাতুল কদর মানুষের জন্য ক্ষমা লাভ ও আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সুযোগ।

লাইলাতুল কদরে করণীয় আমল

লাইলাতুল কদরের রাতকে অর্থবহ করে তুলতে মুসলমানদের বিভিন্ন ইবাদত ও নেক আমলে নিজেকে নিয়োজিত করা উচিত।

১. নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ আদায়

রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক ইবাদত করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন- “রমজানের শেষ দশক এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে অধিক মনোযোগী হতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৭৪)

২. কোরআন তেলাওয়াত ও তা নিয়ে চিন্তা করা

এই রাতে কোরআন নাজিল হওয়ার কারণে কোরআন তেলাওয়াত ও তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।

৩. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা

হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- যদি তিনি লাইলাতুল কদর পান তবে কী দোয়া পড়বেন। তখন তিনি বলেন-উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিজি: ৩৫১৩; ইবনে মাজাহ: ৩৮৫০)

৪. জিকির ও দরুদ শরিফ পাঠ

এই রাতে বেশি বেশি তাসবিহ, তাহলিল, তাহমিদ ও দরুদ শরিফ পাঠ করা উত্তম।

৫. দান-সদকা করা

দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।

৬. আত্মসমালোচনা ও তওবা

এই রাতে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য অতীত ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করা উচিত।

লাইলাতুল কদরে বর্জনীয় আমল

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা রক্ষা করতে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকাও জরুরি।

প্রথমত, গাফিলতি ও অলসতা। এই রাত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই অযথা ঘুমিয়ে বা সময় নষ্ট করে রাত কাটানো উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ। অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে শরীরে অলসতা আসে এবং ইবাদতে মনোযোগ কমে যায়।

তৃতীয়ত, লোক দেখানো ইবাদত। ইবাদত অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে তার সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

চতুর্থত, রেওয়াজি বা ভিত্তিহীন আমল। অনেকে নির্দিষ্ট কোনো রাতকে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর ধরে নিয়ে কিছু প্রচলিত রেওয়াজ পালন করেন, যা কোরআন-হাদিসে প্রমাণিত নয়। এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।

পঞ্চমত, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ও সময় নষ্ট করা। এই বরকতময় রাতকে গল্প-গুজব বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা উচিত নয়।

আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের শিক্ষা

লাইলাতুল কদর মানুষকে শুধু ইবাদতের দিকেই আহ্বান করে না; এটি মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের শিক্ষাও দেয়। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের কল্যাণে কাজ করা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পরিশেষে বলতে চাই, লাইলাতুল কদর ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বরকতময় রাত। এই রাতে ইবাদত, দোয়া, তওবা ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং অগণিত সওয়াব অর্জন করতে পারে। তাই রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তরিকভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা উচিত।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন এবং এই বরকতময় রাতের ফজিলত অর্জনের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

ই-মেইল:[email protected]

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর