ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিনগুলোর একটি। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর এই দিনটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য বিশেষ পুরস্কারস্বরূপ। কিন্তু এই আনন্দ উদযাপন যেন সুন্নাহসম্মত হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে এমন কিছু কাজ করতেন যেগুলো সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত এবং যা অনুসরণ করলে এই দিনটি ইবাদতেও পরিণত হয়।
ঈদের রাতে ইবাদত করা: ঈদের আগের রাতটি অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ দেখার রাতটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে ইবাদত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জেগে থাকবে, তার অন্তর সেই দিন মরবে না যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে। এই রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ, জিকির ও দোয়ায় মশগুল থাকা উচিত।
ভোরে ঘুম থেকে উঠা: ঈদের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং গোসল করা সুন্নাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করতেন। এই হাদিসটি ইবনে মাজাহ (হাদিস: ১৩১৫) এবং বুখারী শরীফে (১/১৩০) বর্ণিত হয়েছে। ঈদের গোসল ফজরের নামাজের পর থেকে ঈদের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় করা যায়। পাশাপাশি মিসওয়াক করাও এই দিনের সুন্নাত।
উত্তম পোশাক পরিধান করা: ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, নবীজি (সা.) দুই ঈদের দিন সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম জামাটি পরিধান করতেন এবং তাঁর একটি বিশেষ পোশাক ছিল যা তিনি দুই ঈদে ও জুমাতে পরতেন। সুনানু বায়হাকি (হাদিস: ৬৩৬৩)।
খেজুর বা মিষ্টি খাওয়া: ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া মাকরূহ। হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে ঈদগাহের উদ্দেশে বের হতেন না এবং তিনি তা বেজোড় সংখ্যক খেতেন। (সহিহ বুখারী: ৯০৫ )।
সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা: ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা সুন্নাত। হজরত ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসুলুল্লাহ (সা.) লোকদেরকে ঈদের নামাজের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন। (বুখারী : ১৪২১)।
তাকবির পাঠ করতে করতে ঈদগাহে যাওয়া: ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তাকবিরের বাক্যটি হলো - “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” নাফি (রহ.) বলেন, ইবনে উমর (রা.) ঈদুল ফিতরের সকালে সশব্দে তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন এবং ইমামের আগমনের আগ পর্যন্ত তাকবির বলতে থাকতেন (সুনানে দারাকুতনী: ১৭১৬)। পুরুষেরা উচ্চস্বরে এবং মহিলারা নীরবে তাকবির পাঠ করবেন।
পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া: হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুন্নাত হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।
ঈদের নামাজ আদায় করা: ঈদের নামাজ পুরুষদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের সময় হলো সূর্যোদয়ের পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত এবং ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ পড়া যায় না। ঈদের নামাজ খোলা মাঠে পড়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত তরিকা ছিল। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, নবী (সা.) ঈদুল ফিতর ও আজহার দিনে ঈদগাহে বের হতেন এবং প্রথম কাজ হিসেবে নামাজ শুরু করতেন। অতঃপর লোকদের দিকে ফিরে দণ্ডায়মান হয়ে তাদেরকে নসীহত ও অসিয়ত করতেন।
খুতবা শোনা: ঈদের নামাজের পর ইমামের খুতবা শোনা সুন্নাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু সায়িব (রা.) বর্ণনা করেছেন যে নবীজি (সা.) নামাজের পরে সাহাবিদের বলেছিলেন যে যার ইচ্ছা সে খুতবা শোনার জন্য বসবে, আর যে যেতে চায় সে চলে যাবে। (সুনানু ইবনু মাজাহ: ১০৭৩)।
ভিন্ন পথে আসা-যাওয়া করা: ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে এবং ফেরার সময় ভিন্ন পথে আসা সুন্নাত। এর পেছনে বিভিন্ন হিকমত বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো দুই পথের মানুষেরাই ঈদের আনন্দের অংশীদার হবেন এবং পথে পথে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
শুভেচ্ছা বিনিময় করা: হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, “সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন "তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম”- যার অর্থ হলো আল্লাহ আমার ও আপনার যাবতীয় ভালো কাজ কবুল করুন।
লেখক: শিক্ষার্থী, শরীফবাগ ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, ধামরাই, ঢাকা-১৩৫০
বিকেপি/এমএম

