বরাবর, সম্মানিত কর্তৃপক্ষ, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।
বিষয়: যুগোপযোগী বেফাক গঠন, সময়মতো ফলাফল প্রকাশ, নজরে সানী ব্যবস্থা ও অন্যান্য সংস্কার প্রসঙ্গে খোলা চিঠি
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ! সম্মানিত দায়িত্বশীলবৃন্দ, আশা করি আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে আপনারা সবাই সুস্থ ও ভালো আছেন এবং দ্বীনের খেদমতে নিরলসভাবে আত্মনিয়োগ করে যাচ্ছেন। কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সর্ববৃহৎ অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যে দূরদর্শিতা, আমানতদারিতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, তার জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
আমাদের আকাবির মুরব্বিদের রেখে যাওয়া এই মহান আমানত- “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ”- কে আপনারা আজও যথাযোগ্য গুরুত্ব ও নিষ্ঠার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য বর্তমান দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের আন্তরিক দুআ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রইলো। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে-বিশেষত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে- প্রায়ই উদ্বেগ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। তা নিরসনের স্বার্থে ও আকাবিরের রেখে যাওয়া আমানত যথাযথ রক্ষার্থে সাহস করে আপনাদের শরনাপন্ন হয়েছি। নীচে ধারাবাহিকভাবে তার কয়েকটি বিষয় আবেদন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
এক.
কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা এবং নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার বিলম্ব: একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
আমরা লক্ষ্য করেছিুবিলম্ব ফি-সহ নিবন্ধন ও পরীক্ষার ফি জমাদানের তারিখগুলো গুরুত্ব সহকারে যথেষ্ট আগেভাগেই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করা হয়। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ফলাফল প্রকাশের নির্দিষ্ট তারিখটি আগেভাগে ঘোষণা করা হয় না। ফলে বেফাকভুক্ত কওমি মাদরাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বারংবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়- পরীক্ষার ফলাফল কবে দিবে? এত বিলম্ব কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। যা অনেক ক্ষেত্রে লজ্জা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
অপরদিকে, ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা, নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম এবং মানসিক প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এতে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বেফাকের প্রতি বেশ অনাস্থা তৈরি হয়।
এমতাবস্থায়, ফলাফল প্রকাশ সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, নির্ধারিত সময়সীমা নির্ধারণ এবং পূর্বঘোষিত তারিখ অনুযায়ী দ্রুত ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
দুই.
পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন (নজরে সানী) প্রসঙ্গ: প্রকাশিত ফলাফলে প্রায়ই দেখা যায়, অনেক ভালো ও মেধাবী ছাত্র পরীক্ষায় তাদের প্রাপ্য নম্বর পায় না। কিন্তু পরে নজরে সানীর আবেদন করলে অনেকেরই নম্বর বেড়ে যায়। বিষয়টি সত্যিই ভাবনার।
প্রথমত, প্রাপ্য নম্বর না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী হতাশ হয়ে পড়ে। এতে তাদের মনে কষ্ট তৈরি হয় এবং বেফাকের উপর আস্থাও কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, যদি নজরে সানী করলেই নম্বর বাড়ে, তাহলে শুরুতেই সঠিকভাবে মূল্যায়ন কেন হচ্ছে না- এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রাপ্য নম্বর পেতে আলাদা আবেদন করতে হবে- এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়।
এছাড়া নজরে সানীর জন্য যে ফি নেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার, যেন এটি সবার জন্য সহজ ও সহনীয় হয়।
তাই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও সঠিক ও নির্ভুল করা এবং নজরে সানীর বিষয়টি সহজ ও ন্যায্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
তিন.
মাদরাসার নাম ও তথ্য সংশোধনে দীর্ঘসূত্রিতা: একটি চরম কষ্টদায়ক বিষয়।
অনেক মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানের নামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভুল সংশোধনের জন্য আবেদন করার পরও দীর্ঘদিন পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
এ ধরনের বিলম্ব শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচয়ই দেয় না, বরং ধীরে ধীরে দেশের সর্ববৃহৎ কওমি শিক্ষাবোর্ডের ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত, কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করে তথ্য সংশোধন প্রক্রিয়াকে সহজ ও সময়োপযোগী করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
চার.
বেফাকের নূরানী পাঠ্যপুস্তকের মান ও বানান নিয়ে প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ধরে বেফাকের নূরানী পাঠ্যপুস্তকের মান ও বানানগত ত্রুটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠে আসছে। অনেক শিক্ষকের মতে, এসব বইয়ে এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা শিক্ষাদানকে সহজ করার পরিবর্তে কখনো কখনো জটিল করে তোলে।
ফলস্বরূপ, দেখা যায়- বেফাকভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান মানগত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব পাঠ্যপুস্তক সিলেবাস থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি একটি শিক্ষাবোর্ডের জন্য মোটেও প্রত্যাশিত নয়। এ অবস্থায়, নূরানী পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়ন, বানান সংশোধন এবং বিষয়বস্তুকে আরও নির্ভুল ও যুগোপযোগী করার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
একই সঙ্গে সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় বেফাকের সামগ্রিক কার্যক্রমকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করে তোলার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, অনলাইন ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রবাহের সহজীকরণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই- দেশের তরুণ আলেম সমাজ আজ জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে। তাদের মধ্যে রয়েছে নতুন চিন্তা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। তাই বেফাকের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুব আলেমদের অংশগ্রহণ ও পরামর্শ গ্রহণ করলে প্রতিষ্ঠানটি আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়ে উঠবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
আমাদের এই অনুরোধ সমালোচনা নয়; বরং ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা থেকেই উত্থাপিত। আমরা চাই, মুরব্বিদের বহু কষ্ট ও স্বপ্নে তিলে তিলে গড়ে তোলা “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ” আরও সুসংগঠিত, গতিশীল ও সময়োপযোগী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক—যা উম্মাহর কল্যাণে আরও ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন এবং দ্বীনের এই গুরুত্বপূর্ণ খেদমতে আপনাদের আরও তাওফীক দান করুন। আমীন।
(দেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত উস্তাদ ও প্রিয় ছাত্রদের পক্ষ থেকে পরীক্ষা প্রস্তুতি একাডেমি’র বিভিন্ন কর্মশালায় উত্থাপিত প্রশ্ন, মতামত ও গঠনমূলক অভিযোগের আলোকে প্রণীত এই খোলা চিঠি)
বিনীত
সচেতন শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে আমীনুর রহমান নড়াইলী
পরিচালক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

