ইসলামি শিক্ষা ও প্রতিষ্টানগুলোর আদব ও আখলাক অন্য কোন আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মতো হবে না এটাতে আমরা সবাই একমত। আমরা চাই ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা আপন স্বয়কিয়তায় বেড়ে উঠুক। নিজেদের চলে আসা সেই আদর্শ ও ঐতিহ্যে অটুট থাকুক। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার নামে বর্তমানে যে হারে মাদরাসার সংখ্যা বাড়ছে, সে হিসাবে জাতীয়ভাবে তদারকি না থাকার ফলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আজ অধঃপতনের দিকে চলে যাচ্ছে। নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে; যা সমাজে প্রচলিত মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে আশঙ্কার তৈরি করেছে।
আধুনিক যুগ চাহিদা অনুযায়ী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার যে সংস্কার ও পরিবর্তনগুলোর প্রয়োজনীয়তা দৃশ্যমান, এগুলো এখনো অবধি অবহেলায় রয়ে গেছে।
বিশেষ করে কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর যে শিক্ষা বোর্ডগুলো রয়েছে, তাদের কথা না বলে পারলাম না, হাইয়াতুল উলিয়া বোর্ড, বেফাকুল মাদারিস ও অন্যান্য। এই শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রচলিত এই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি-অগ্রগতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা যদি শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নতির জন্য এগিয়ে না আসে তাহলে সংস্কার ও পরিবর্তনের কাজগুলো করবে-টা কে?
বছরে একটা বোর্ড পরীক্ষা আয়োজনের জন্য আকাবিরগণ এই শিক্ষা বোর্ডগুলো রেখে যাননি। সমস্ত কওমি মাদরাসা এবং শিক্ষা-সংস্কারে প্রতিনিধিত্ব ভূমিকা রাখতে এই বোর্ডগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিছু মহলের বেপরোয়া সীদ্ধান্ত কেন আমাদের পুরো জাতির শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?
আশ্চর্য বিষয়, অনেকেই এই বিষয়গুলো জানার পরেও কথা বলছেন না। আমরা বোর্ড পরীক্ষা আর ফলাফলের জন্য এই বোর্ডগুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছে এটাই মনে করে নিয়েছি। ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না, এই বেফাক বোর্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস পড়লে দেখবেন, কওমি মাদরাসার একটি বিশাল অংশকে কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়াও এই বোর্ডের একটি লক্ষ্য ছিল। কিন্তু আজ হচ্ছে টা কি?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এই অধঃপতনের জন্য দায়ী কারা, কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং যুগোপযোগী করার পিছনে বাধা কে? এসব বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।
দায়িত্বশীল মহলের নির্দিষ্ট কিছু কাজ ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তাই আজ আমরা আশাহত। বিষয়গুলো সবাই প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলার জোর দাবি জানাচ্ছি।
তাছাড়া এখানে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ও নানান ঘাটতি রয়েছে, প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের উন্নতি ও অগ্রগতি নিয়ে ভাবে, তাহলে আশাকরি প্রতিষ্ঠানিক এ ঘাটতিগুলো দূর হবে কিছুটা হলেও।
ইসলামি মাদরাসাগুলোর উপযোগিতা, গুরুত্ব এবং সার্থকতা এমন এক স্বীকৃত বাস্তবতা যা দ্বীনি ফিকির ও চেতনাধারী কোনো ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না। নীতিগতভাবে প্রতিটি মাদরাসার তিনটি মৌলিক উপাদান থাকে: শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত অস্তিত্ব। এই তিনটি উপাদানকে বিকশিত করেন মাদরাসার পরিচালক এবং শিক্ষকগণ, যারা মূলত এই ইলমি ও আধ্যাত্মিক বাগানের মালি। এটা স্পষ্ট যে, এই ব্যক্তিরা যেমন যোগ্যতা, আবেগ ও সাহসের অধিকারী হবেন, প্রতিষ্ঠানটিও সেই অনুপাতে উন্নতির পথে অগ্রসর হবে।
আমার সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষকদের জন্য নিচে কিছু নিবেদন পেশ করছি। আমাদের আকাবিরদের থেকে নেওয়া এই সংশোধনমূলক পরামর্শগুলো আমাদের জন্য উপকারী হবে, ইনশাআল্লাহ।
১. মুরুব্বীদের সাথে একনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা
যেকোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে সঠিক ও মানসম্মত পদ্ধতিতে চালানোর জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও দায়িত্বশীল মুরুব্বীদের সাথে একনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা জরুরি। মাদরাসার অবস্থা সময় সময় তাদের জানানো এবং তাদের অভিভাবকত্বে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা উচিত। আজকের এই অধঃপতনের যুগে অনেকে এই বিষয়ে গাফিলতি করেন। পরিচালক ও শিক্ষকদের উচিত কেবল প্রচারপত্র বা মুখে তাদের নাম ব্যবহার না করে, বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ নেওয়া এবং মাদরাসার নেজামে তাদের সংশোধনমূলক পরামর্শের প্রতি গুরুত্ব দেয়া।
২. মেহনতের মূল কেন্দ্র হোক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
একজন মাদরাসা পরিচালকের জন্য ইখলাস ও আমানতদারির পাশাপাশি ইলমি রুচি থাকা আবশ্যক। কারণ ‘মানুষ তার নেতার আদর্শ অনুসরণ করে’। আজকের দিনে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা শিক্ষার মানের চেয়ে দালানকোঠা নির্মাণ এবং অর্থ সংগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ফলে মাদরাসা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হলেও মূল মাকসাদ অর্থাৎ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ফলাফল শূন্য হয়ে পড়ছে। আমাদের আকাবিরদের ইতিহাস হলো, তারা সবসময় মানুষের যোগ্যতার ওপর মেহনত করেছেন, দান খয়রাত ও বড় বড় দালানকোঠা তৈরির ওপর নয়। মনে রাখতে হবে, বড় মাদরাসা সেটিই যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়, দালান বড় হলেই যে মাদরাসা বড় এমনটা নয়।
৩. যোগ্য ও সুস্থ রুচির শিক্ষক নির্বাচন
মাদরাসার উন্নতির মেরুদণ্ড হলো পরিশ্রমী ও মুখলিস শিক্ষক। শিক্ষক কেবল পড়ান না, বরং তিনি জাতির সন্তানদের জন্য একজন আদর্শ । তার চিন্তা-চেতনা, কথা ও কাজ ছাত্রের মধ্যে মধ্যেই স্থানান্তরিত হয়। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল যোগ্যতা দেখেই নয়; দ্বীনি মেজাজ ও চারিত্রিক মাধুর্য দেখা জরুরি। আর প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের আরেকটি দিক হচ্ছে, নিজেদের পরিচিত ও নিকটজনের নিয়োগ। এটা করাতে অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের কর্মে ঘাটতি দেখা দিলেও কোন পদক্ষেপ নেয়া যায় না। তাই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দেখে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া।
৪. শিক্ষকদের সাথে কর্তৃপক্ষের আচরণ
মাদরাসার পরিচালক বা মুহতামিম হওয়া এক বিশাল দায়িত্ব। তার মন হবে বিশাল এবং আচরণ হতে হবে স্নেহমাখা। শিক্ষকদের সাথে চাকরদের মতো ব্যবহার করা চরম নিচু মানসিকতা। সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সম্পর্ক ঠিক রাখা সকল স্টাফদের সাথে। মুহতামিম যেন কোনো শিক্ষককে তুচ্ছ না ভাবেন, এদিকে ও লক্ষ্য রাখা উচিত। কারণ শিক্ষকদের সম্মান ও উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকে থাকে।
৫. লেনদেনে স্বচ্ছতা
ইসলামে ইবাদতের পাশাপাশি মুয়ামালাত বা লেনদেন পরিষ্কার রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, অনেক মাদরাসা কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের বেতন বা পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করেন। এবং এটিকে দ্বীনী খেদমত বলে চালিয়ে দেন। এই ধরনের অস্বচ্ছতা কোনো আলেম বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের জন্য শোভনীয় নয়। আর শিক্ষকদের যে বর্তমান বেতনের পরিমাণ, তা এই পেশা করে একজন মানুষ চলার মতো না। তাই শিক্ষকদের শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সুযোগ দেয়া উচিত। অথবা বেতন বৃদ্ধি করা উচিত।
লেখক: পরিচালক, দারুল কোরআন মডেল মাদরাসা ডেমরা, ঢাকা। সম্পাদক, কলমালাপ সাহিত্য ম্যাগাজিন।

