Logo

ধর্ম

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস

ইসলামে স্বাধীনতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০০:৪০

ইসলামে স্বাধীনতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

আজ বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ- মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০২৬। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ দিনটি এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে শুরু হয়েছিল বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। লাখো শহীদের আত্মদান, অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগ এবং কোটি মানুষের অদম্য সাহসিকতায় অর্জিত হয় আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এটি মানুষের সত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ চিন্তা, বিবেক, বিশ্বাস ও কর্মে স্বাধীন থাকতে চায়- এটাই তার স্বভাব। তাই যখন এই স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তখন সে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামও ছিল সেই স্বাভাবিক মানবিক ও ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন।

স্বাধীনতার ইতিহাস ও চেতনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়; এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিরও প্রতীক। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

এই যুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে হয় এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে হয়। স্বাধীনতা দিবস তাই কেবল স্মৃতিচারণের দিন নয়; এটি নতুন করে জাগ্রত হওয়ার দিন। কিন্তু স্বাধীনতার বহু বছর পরও আমাদের সমাজে দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় রয়ে গেছে। তাই স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার মূলনীতি

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাধীনতা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলাম মানুষকে চিন্তা, বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীর সবাই ঈমান আনত; তবে কি তুমি মানুষকে মুমিন হওয়ার জন্য বাধ্য করবে?” (সূরা ইউনুস :৯৯) এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ইসলাম জোরপূর্বক বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নয়। বরং মানুষ যেন স্বাধীনভাবে সত্যকে উপলব্ধি করে এবং নিজের ইচ্ছায় তা গ্রহণ করে- এটাই ইসলামের শিক্ষা। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা:২৫৬) এ আয়াত ইসলামের মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য উদাহরণ।

প্রকৃত স্বাধীনতা: ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন ভোগবাদ বা ইচ্ছামতো চলা নয়। বরং প্রকৃত স্বাধীনতা হলো- মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, বলুন, আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”(সূরা আল-আন‘আম:১৬২) এই আয়াত আমাদের শেখায়, একজন মুমিন তার জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালনা করে। এটিই প্রকৃত মুক্তি, যা মানুষকে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবতার পথে পরিচালিত করে।

স্বদেশপ্রেম: নবীজীর (সা.) আদর্শ

ইসলামে স্বদেশপ্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। মক্কা ত্যাগের সময় তিনি গভীর আবেগে বলেন: আল্লাহর কসম! তুমি (মক্কা) আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (জামে তিরমিযি: ৩৯২৫) এতে বোঝা যায়, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ঈমানি অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আরেক হাদিসে এসেছে: উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও তাকে ভালোবাসি।”(সহিহ বুখারি: ২৮৮৯; সহিহ মুসলিম: ১৩৯২) এখানে শুধু ভূমির প্রতি নয়, বরং নিজের পরিবেশ ও ঐতিহ্যের প্রতিও ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

বিজয়ের মহিমা: ক্ষমা ও মহানুভবতা

মক্কা বিজয়ের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন নির্যাতনের পর বিজয় অর্জন করেও রাসুল (সা.) প্রতিশোধ নেননি। বরং তিনি ঘোষণা করেন: আজ তোমাদের প্রতি কোনো দোষারোপ নেই; তোমরা সবাই মুক্ত।”(সুনানে বাইহাকী: ৯/১১৮) এই মহানুভবতা আমাদের শেখায়- প্রকৃত বিজয় প্রতিশোধে নয়, বরং ক্ষমা ও মানবিকতায়।

স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক

স্বাধীনতা কখনো দায়িত্বহীনতা নয়। বরং এটি একটি বড় আমানত। একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব- 

* দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা

* আইন ও নৈতিকতা মেনে চলা

* অন্যের অধিকার সম্মান করা

* সমাজে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।ইসলামও এই দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। কারণ স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হয়।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

বর্তমান সময়ে স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-

১. নৈতিকতা ও আদর্শ চর্চা: ব্যক্তিগত জীবনে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।

২. দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণ: সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. শিক্ষার প্রসার: অজ্ঞতা দূর করে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

৪. ধর্মীয় সহনশীলতা: সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

৫. দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া: দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

পরিশেষে, মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। তবে এই স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য তখনই উপলব্ধি করা যাবে, যখন আমরা এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারব। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত স্বাধীনতা হলো- আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত জীবন, ন্যায় ও মানবতার পথে অগ্রসর হওয়া এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

ইরশাদ হয়েছে, হে আমার প্রতিপালক! এ নগরীকে শান্তিময় কর এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ।”(সূরা ইবরাহিম:৩৫)

আসুন, এই মহান দিনে আমরা সবাই অঙ্গীকার করি- নিজেদের জীবনকে ইসলামের আদর্শে গড়ে তুলব এবং একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। দোয়া: আল্লাহুম্মাহফাজ বিলাদানা বাংলাদেশ।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে কিয়ামত পর্যন্ত নিরাপদ ও সমৃদ্ধ রাখুন। আমিন।

লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর