Logo

ধর্ম

কেন জরুরি শাওয়ালের ৬ রোজা

Icon

মাসউদুল হক শিবলী

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩২

কেন জরুরি শাওয়ালের ৬ রোজা

রমজানের বরকতপূর্ণ দিনগুলো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। বিদায় নিয়েছে দিনভর কঠোর আত্মসংযমের সাধনা, কিয়ামুল লাইলের প্রশান্তি আর কোরআনের তিলাওয়াতে মুখরিত রজনীগুলো। এক মাসব্যাপী যে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে আমরা অতিবাহিত করলাম, তার রেশ কি আমাদের যাপিত জীবনে এখনো অবশিষ্ট আছে? নাকি ঈদের খুশির জোয়ারে আমরা ভেসে গিয়ে ৩০ দিনে অর্জিত তাকওয়াকে কোনো এক সিন্দুকে বন্দি করে ফেলেছি? রমজান কোনো সাময়িক উৎসব নয়, এটি আগামী এগারো মাসের জন্য পাথেয় সংগ্রহের এক অনন্য কর্মশালা। রমজান পরবর্তী এই সময়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে শাওয়ালের ছয় রোজা। এটি কেবল একটি নফল ইবাদত নয়, বরং রমজানের কবুলিয়াতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন এবং ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষার এক সুদৃঢ় সেতুবন্ধন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।" (সহীহ মুসলিম: ১১৬৪)। এই হাদিসের অর্থ যদি আমরা অনুধাবন করি, তবে দেখব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য কত বড় অনুগ্রহের দুয়ার খুলে রেখেছেন। এক মাসের সিয়ামের সাথে মাত্র ছয়টি দিনের সংযোজন আমাদের পুরো বছরের আমলনামাকে রোজার নেকীতে পূর্ণ করে দিচ্ছে। এটি কি কেবল গাণিতিক হিসাব? না, এটি মূলত মুমিনের হৃদয়ে ইবাদতের স্পৃহা জাগিয়ে রাখার এক আসমানী ব্যবস্থাপনা। রমজানের ত্রিশটি রোজার সওয়াব দশ গুণ করলে হয় তিনশ দিন। আর শাওয়ালের ছয় রোজার সওয়াব দশ গুণ করলে হয় ষাট দিন। এই মোট তিনশ ষাট দিন বা এক চান্দ্র বছরের সমান সওয়াব অর্জিত হয়। এই হিসাব কেবল গাণিতিক নয়; এর আড়ালে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা। আল্লাহ চান না তাঁর বান্দা কেবল একটি মাস তাঁর সান্নিধ্যে থাকুক, চান বান্দার পুরো বছরটাই যেন ইবাদতের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।

আধুনিক মুসলিম জীবনে আমরা এক অদ্ভুত দ্বৈততার শিকার। রমজানে আমাদের মসজিদগুলো মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দান-সদকার জোয়ার বয়ে যায়। গুনাহ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকার একটি প্রচেষ্টা কমবেশি সবার মাঝেই লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথেই যেন কোন এক অজানা কারণে সবকিছু আমূল বদলে যায়। আমরা আবার সেই পুরনো গাফলতি, সেই পুরনো অনৈতিকতা আর অলসতায় নিমজ্জিত হই। এই যে 'সিজনাল মুসলিম' হওয়ার প্রবণতা, এটি আমাদের ঈমানি দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। শাওয়ালের ছয় রোজা আমাদের এই গাফলতির বলয় থেকে বেরিয়ে আসার এক মোক্ষম সুযোগ করে দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রমজানের রব আর শাওয়ালের রব অভিন্ন।

ইবাদত কোনো নির্দিষ্ট মাসের ফ্রেমে বন্দি নয়, বরং এটি মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা যদি রমজানের পর ইবাদত ছেড়ে দিই, তবে বুঝতে হবে আমাদের সিয়াম সাধনা ছিল কেবল একটি প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা, যা হৃদয়ের গভীরে কোনো পরিবর্তন আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

শাওয়ালের এই ছয় রোজা একজন মুমিনের জন্য এক আধ্যাত্মিক পরীক্ষার মতো। রমজানে পরিবেশ ছিল অনুকূল, শয়তান ছিল শৃঙ্খলিত, চারদিকে ছিল ইবাদতের আবহ। কিন্তু শাওয়ালে সেই পরিবেশ নেই। এখন আপনাকে নিজের নফসের সাথে লড়াই করে রোজা রাখতে হবে। এই লড়াইটিই প্রকৃত মুমিনকে সাধারণ থেকে আলাদা করে দিবে। শাওয়ালের রোজার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, আমরা কেবল পরিবেশের প্রভাবে ইবাদত করিনি। বরং রব্বে কারীমের সন্তুষ্টির জন্যই সিয়াম পালন করেছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, আমলের ধারাবাহিকতাই হলো ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম লক্ষণ।

বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের মতে, "কোনো নেক আমলের প্রতিদান হলো তার পরে আরেকটি নেক আমল করার তৌফিক পাওয়া।" যদি রমজানের পর আমাদের আমলের গতি মন্থর হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে আমাদের তাকওয়া অর্জনের পথে কোথাও না কোথাও একটি গোপন দুর্বলতা রয়ে গেছে। রমজান ছিল একটি বীজ বপনের সময়, আর শাওয়াল হলো সেই চারাগাছটিকে পরিচর্যা করে মহীরুহে পরিণত করার সূচনাকাল।

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এই ধারাবাহিক ইবাদতের প্রভাব অপরিসীম। একটি সমাজ যখন কেবল নির্দিষ্ট সময়ে ধার্মিক হয়, তখন সেই সমাজে নৈতিকতার স্থায়ী ভিত্তি গড়ে ওঠে না। কিন্তু যখন ব্যক্তি তার ইবাদতকে সারা বছরের রুটিনে পরিণত করে, তখন তার চরিত্রে এক ধরনের অপার্থিব পবিত্রতা আসে। শাওয়ালের রোজা আমাদের ধৈর্য ও সংযমের সেই পাঠকে পুনরুজ্জীবিত করে, যা আমরা রমজানে শিখেছিলাম। এটি আমাদের শেখায় যে, ভোগের চেয়ে ত্যাগের আনন্দ অনেক বেশি টেকসই। সমাজ যখন দেখবে একদল মানুষ কেবল লোকদেখানো নয়, বরং নিভৃতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বছরের অন্যান্য সময়েও ইবাদতে মশগুল রয়েছে, তখন সেই সমাজের নৈতিক মানদণ্ড এমনিতেই উন্নত হবে। আজকের ভোগবাদী বিশ্বে আমরা যখন বস্তুগত অর্জনের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছি, তখন এই নফল ইবাদতগুলো আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। এটি আমাদের যান্ত্রিক জীবন থেকে ক্ষণিকের বিরতি দিয়ে মহান রবের সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা মানে হলো, হে আল্লাহ! কেবল রমজানেই নয়, আমি তোমার সান্নিধ্যে আরও কিছুটা সময় কাটাতে চাই। এই যে আকৃতি, এই যে ব্যাকুলতা, এটাই তো প্রকৃত বন্দেগি। অনেক সময় আমরা মনে করি, রমজানের পর আবার রোজা রাখা হয়তো অনেক কঠিন হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শরীর যখন এক মাস সিয়ামে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন এই ছয়টি রোজা রাখা মোটেও কষ্টকর নয়। উল্টো এটি আমাদের শরীর ও মনের জন্য এক ধরনের 'কুলিং ডাউন' পিরিয়ড হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও রমজানের দীর্ঘ উপবাসের পর হঠাৎ করে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শাওয়ালের এই ছয় রোজা আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সাহায্য করে। তাই এই রোজা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, শারীরিক কল্যাণেরও এক অনন্য মাধ্যম।

আমাদের সমাজে কিছু মানুষের মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, শাওয়ালের রোজা কেবল নারীদের জন্য বা বয়স্কদের জন্য। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাসুলুল্লাহ সা. এর এই আহবান ছিল সকল মুমিনের জন্য। যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই উচিত এই অমূল্য নেকীর অংশীদার হওয়া। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা যদি এই বয়সে নফসের কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করে শাওয়ালের রোজা রাখতে পারে, তবে তাদের চরিত্রে যে দৃঢ়তা আসবে, তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আলোকিত করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইবাদত কেবল পরকালের মুক্তির পথ নয়, বরং ইহকালেও এটি আমাদের আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক শক্তির উৎস।

আজকের মুসলিম উম্মাহর দিকে তাকালে আমরা দেখি এক চরম অস্থিরতা। আমরা ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতায় মগ্ন থাকলেও তার সারমর্ম থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। আমাদের ইবাদতগুলো যদি আমাদের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে সেই ইবাদতের সার্থকতা কোথায়? শাওয়ালের ছয় রোজা আমাদের সুযোগ করে দেয়, নিজেদের ভুলগুলো শুধরেনেওয়ার, ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এবং আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার।

পরিশেষে বলতে চাই, সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। শাওয়াল মাসও তার নিজস্ব গতিতে ফুরিয়ে যাবে। আমাদের অলসতা আর গাফলতি যেন এই মহান সওয়াব থেকে আমাদের বঞ্চিত না করে। আসুন, আমরা রমজানের সেই আধ্যাত্মিক চেতনাকে ধারণ করি। শাওয়ালের ছয় রোজার মাধ্যমে আমাদের ইবাদতের মিরাজকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাই। মনে রাখবেন, মৃত্যু আমাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মাস বা সময়ের অপেক্ষা করবে না। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতের রঙে রাঙিয়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজান পরবর্তী জীবনেও ইবাদতের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন।

আমাদের জাতীয় জীবনেও এই ইবাদতের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। আমরা যদি কেবল রমজানেই সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ হই আর বাকি এগারো মাস দুর্নীতির সাগরে নিমজ্জিত থাকি, তবে সেই জাতির উন্নতি অসম্ভব। শাওয়ালের রোজা আমাদের শেখায় যে, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা কোনো ঋতুভিত্তিক বিষয় নয়। এটি একটি জীবনদর্শন। একজন মুমিন যখন শাওয়ালের রোজা রাখে, সে আসলে ঘোষণা দেয় যে, সে তার নফসের গোলাম নয়, বরং সে কেবলই মহান আল্লাহর গোলাম। এই গোলামিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। আসুন, আমরা এই স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করি এবং শাওয়ালের ছয় রোজার মাধ্যমে আমাদের ঈমানি চেতনাকে শাণিত করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখক: আলেম, লেখক, প্রাবন্ধিক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর