Logo

ধর্ম

শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা-১৬

কওমি শিক্ষকদের অজিফা হোক সম্মানজনক

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৭:৪০

কওমি শিক্ষকদের অজিফা হোক সম্মানজনক

কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় আসা প্রতিটি নবীন উস্তাজের মনে প্রথম দিনগুলোতে থাকে প্রবল আবেগ ও দ্বীনের খেদমতের অপরিসীম আগ্রহ। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়শই ভিন্ন। মুহতামিমগণ সেই আবেগেরই সদ্ব্যবহার করেন। শিক্ষকের ওপর নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়: আবাসিক থাকতে হবে, পড়ানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ করা যাবে না, সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই দিন ছুটি, তাও জুমার দিন বিকেলে ফিরতে হবে। সার্বক্ষণিক মাদরাসায় থেকে নেগরানির দায়িত্ব পালন করতে হবে। আবেগী নবীন এসব শর্ত মেনে নেন অনায়াসে। কিন্তু কর্মজীবনের শুরুতে বেতন নির্ধারিত হয় সর্বোচ্চ সাত-আট হাজার টাকা। অথচ কয়েক বছর আগেও তা ছিল চার-পাঁচ হাজার।

প্রথম কয়েক মাস বেতন ঠিকঠাক পেলেও ঈদের পর থেকেই শুরু হয় অনিশ্চয়তা। এখন নিজেকেই কালেকশন করে বেতন তুলতে হবে, অথবা পরবর্তী রমজানের অপেক্ষায় থাকতে হবে। খাবারের পাতে প্রতিদিন একই ডাল-ভাত। পড়ালেখার ফাঁকে ভালো কিছু খাবারের আয়োজন তো দূরের কথা। হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন।

প্রথম বছর থেকেই ছয়-সাতটি দরসের দায়িত্ব দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখা হয়। এরপর সংসার শুরু হয়। বিয়ে, সন্তান-একে একে যোগ হয় দায়িত্ব। আয় আর ব্যয়ের মিল মেলাতে গিয়েই হিমশিম খেতে হয় নবীন উস্তাজকে। ভাটা পড়ে মেহনতে। পেশার প্রতি একধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়। তবুও দ্বীনের ইলমের খেদমত বলে সবরের পথ বেছে নিতে হয়। ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়। একপর্যায়ে অনেক মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষক বাধ্য হয়েই ইমামতি, ওয়াজ বা হজ এজেন্সির প্রতিনিধিত্বের মতো পেশায় চলে যান। আগের আবেগে আর টিকে থাকতে পারেন না।

এটি কোনো কল্পিত গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের বাস্তব একটি খণ্ডচিত্র। এর চেয়েও কষ্টের গল্প আছে।

আলিয়া মাদরাসা বা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বেতনকাঠামোর সঙ্গে কওমি মাদরাসার উস্তাদের বেতনের তুলনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। কওমি শিক্ষকদের মেহনত বেশি, বেতন কম। অন্যদিকে আলিয়া ও কলেজের মেহনত তুলনামূলক কম, কিন্তু বেতন অনেক বেশি। ফলে দিন দিন কওমি মাদরাসার মেধাবী শিক্ষকেরা খেদমতের প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে যাচ্ছেন। ফলাফল আজ সবার চোখের সামনে।

অনেকে এই আলোচনাকে দুনিয়াদারি বলে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু তাদের জন্যই বলছি, যাদের আয়ের নানা পথ খোলা, যারা বৈষয়িক বিষয়ে কোনো ছাড় দেন না, তাদের কথায় আমি বিচলিত নই। কিন্তু কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের কথা আলাদা। তাদের বেতনকাঠামো হতে হবে সম্মানজনক। আলিয়া বা স্কুল-কলেজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রেখেই এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। শিক্ষকদের নিজেদেরও সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজ অধিকারের কথা বলা শিখতে হবে। যারা মাদরাসা পরিচালনা করেন, তাদেরও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। কওমির মেধাবী শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে ইলমি ইনহিতাত (শিক্ষার মানগত দুর্বলতা) আরও বাড়বে।

যদি ত্যাগের কথা আসে, তবে মাদরাসার সাধারণ শিক্ষকের সঙ্গে মুহতামিমেরও ত্যাগের মানদণ্ড সমান হতে হবে। বৈষম্য যত গভীর হবে, ভবিষ্যতে ক্ষোভ ফুঁসে ওঠা অসম্ভব নয়।

তবে স্মর্তব্য, যাদের সামর্থ আছে, তাঁরা বিনা বেতনে বা বিনা অজিফায় দ্বীনের খেদমত করবেন, সেটিই উত্তম পথ। কিন্তু যেখানে বাজারচলতি নিয়মে অজিফা দিতেই হবে, সেখানে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় নিয়ে বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষকদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব করবে- এমন একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা যেতে পারে, যা তাদের কথা বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

অনেক শিক্ষকের জন্যই মাদরাসার অজিফাই একমাত্র আয়ের পথ। সংসার চলে শুধু সেটার ওপর নির্ভর করে। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে শিক্ষকের সম্মানজনক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে নতুন করে ভাবতে হবে। যারা প্রাইভেট মাদরাসা পরিচালনা করেন, তাদের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী মাদরাসা পরিচালনা করা এবং শিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী দেওয়া। অন্যথায় বড় পরিসরে মাদরাসা না করাই শ্রেয়।

প্রাচীন ধারার মাদরাসা ও ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবহার করে যারা প্রতিষ্ঠান চালান, তারা চাইলে অর্থনৈতিকভাবে জায়গা-জমি কাজে লাগিয়ে আয় বাড়াতে পারেন। ইচ্ছে করলেই কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের সম্মানী ও অজিফা সম্মানজনক করতে পারেন। তবে লক্ষ রাখতে হবে, মাদরাসার ভবন নির্মাণ বা সাজসজ্জার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষক। তাঁরা যদি সম্মান না পান, তাহলে মাদরাসার রূহ বা প্রাণই থাকে না। প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি তাঁরা, তাই তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি উদ্বেগের বিষয় হলো- মাদরাসার সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান কমছে। কোনো কোনো মাদরাসার শিক্ষার মান অনেক উন্নত এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বচ্ছতা জরুরি। অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন নিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেয়। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ কেউই ক্ষতিগ্রস্ত না হন। সবপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি যৌক্তিক ও সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে অনেক মাদরাসায় বিশৃঙ্খলা চলছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ অনেকেই মেনে নিতে নারাজ, কিন্তু বেসরকারিভাবে সব পক্ষ মিলে যদি শিক্ষকদের জন্য একটি বেতন স্কেল নির্ধারণ করা যায়, তবে সেই নীতিমালা মেনে চলা সম্ভব। এতে শিক্ষকদের বেতন ন্যায্য ও সম্মানজনক হবে এবং কেউ ইচ্ছে করলেই তাঁদের বাদ দিতে পারবেন না। এটি কঠিন হলেও সদিচ্ছা থাকলে বাস্তবায়ন সম্ভব।

অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ও দারিদ্র্যের মধ্যে একজন শিক্ষক খুশি মনে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন। কর্মঠ শিক্ষকেরা হয়তো সেটা উপেক্ষা করেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা শিক্ষকের মনের প্রশান্তি আনে। ফলে তিনি নিজের পরিবার ও সন্তানের প্রতিও ভালোভাবে খেয়াল রাখতে পারেন। তাই শিক্ষকের বেতন সময়মতো ও সম্মানজনকভাবে পরিশোধ করা উচিত।

বেতন আদায়ের পদ্ধতিটাও হতে হবে সম্মানজনক। শিক্ষককে যাতে বেতন চাইতে গিয়ে মুহতামিমের কাছে হাত পেতে দাঁড়াতে না হয়, সেজন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা হিসাব বিভাগের মাধ্যমে নিয়মিত বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আমরা জানি, মাদরাসার অজিফা শিক্ষার বিনিময় নয়, বরং এটি সম্মানী ও ভাতা। তাই সেটি সম্মানের সঙ্গেই প্রদান করা উচিত। আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিটি মাদরাসা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও সমৃদ্ধ হোক এবং সেখানে শিক্ষকদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক

পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন