মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.)
পটিয়া মাদরাসার মহীরুহের বিদায়
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০১:২৯
গতকাল সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬- দ্বীনি অঙ্গনের ইতিহাসে একটি ভারী, নীরব এবং শোকাবহ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনে আমরা হারালাম এক প্রজ্ঞাবান আলেম, এক নিবেদিত শিক্ষক, এক নীরব সংস্কারক এবং এক রূহানী পথপ্রদর্শককে- মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.)।
তিনি আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রামের সম্মানিত মুহতামিম এবং আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের সভাপতি।
দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ ছিল না- বরং ছিল একটি শূন্যতার ঘোষণা।
আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র নই। তাঁর দরসে বসে শিক্ষা গ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু একজন সমসাময়িক লেখক হিসেবে তাঁর জীবন, কর্ম, চিন্তা ও প্রভাবকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। সেই অবস্থান থেকেই আজ অনুভব করছি-এই প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; এটি এক ধারার স্তব্ধতা, এক ঐতিহ্যের ক্ষত, এক নীরব আলোকবর্তিকার নিভে যাওয়া।
একটি প্রতিষ্ঠানের অন্তরাত্মা
আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া-এই নামটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি ইতিহাস, একটি ধারাবাহিকতা, একটি আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির প্রতীক। এখানে শিক্ষা মানে কেবল কিতাব পড়া নয়; বরং নিজেকে গড়া, চরিত্র নির্মাণ করা এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা।
এই প্রতিষ্ঠানের দেয়াল, এর মসজিদ, এর মেহমানখানা- সবকিছুতেই রয়েছে ত্যাগ, সাধনা ও ইখলাসের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ধারক ও বাহকদের একজন ছিলেন মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.)- যিনি প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরিচালনা করেননি; বরং নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলেন।
শেকড় থেকে শিখরে ওঠার গল্প
১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক দ্বীনদার পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে দ্বীন ছিল জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তাঁর ইলমের যাত্রা শুরু হয় ধীরে ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে। পটিয়া জামিয়া তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এরপর দারুল উলুম দেওবন্দ- যেখানে ইলমের গভীরতা তাঁকে সমৃদ্ধ করে। নদওয়াতুল উলামা, লখনৌ- যেখানে তাঁর ভাষা ও সাহিত্যচেতনা বিকশিত হয়।
এই তিন ধারার সম্মিলন তাঁকে গড়ে তোলে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে- যেখানে ঐতিহ্য, বুদ্ধিবৃত্তিকতা এবং রূহানিয়াত একসাথে বিকশিত হয়েছে।
নীরব আত্মনিবেদন
১৯৮৫ সালে তিনি শিক্ষক হিসেবে পটিয়া জামিয়ায় যোগ দেন। কিন্তু এই যোগদান ছিল না কোনো প্রতিষ্ঠিত আলেমের গর্বিত প্রবেশ; বরং ছিল এক মুজাহিদের নীরব সূচনা।
বিনা বেতনে খেদমত করা, মেহমানখানায় অবস্থান করা, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করা—এসব ছিল তাঁর জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু এসব কষ্ট তাঁর ভেতরের আলোকে নিভিয়ে দেয়নি; বরং আরও উজ্জ্বল করেছে।
দায়িত্বের পথে অবিচল অগ্রযাত্রা
১৯৮৮ সালে কেন্দ্রীয় মসজিদের খতীব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুরু হয়। তাঁর খুতবায় ছিল জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং হৃদয়ের আবেদন।
১৯৯৭ সালে দারুল ইকামার নাজেম হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রায় ২৫ বছর ছাত্রজীবনের শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে সহকারী মুহতামিম ও নায়েবে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন- নেতৃত্ব মানে পদ নয়; বরং দায়িত্ববোধ ও আমানতদারী।
ঝড়ের সময়ের নাবিক
২০২৪ সালে যখন প্রতিষ্ঠান অস্থির সময় পার করছিল, তখন তাঁকে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। চাপ, সমালোচনা ও অপপ্রচারের মাঝেও তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি প্রতিক্রিয়াশীল হননি; বরং ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।
রূহানিয়াত: তাঁর শক্তির উৎস
তাঁর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর রূহানিয়াত। তাহাজ্জুদ, জিকির, দোয়া-এসব ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন- আত্মিক শক্তিই মানুষের প্রকৃত শক্তি।
রচনাবলী: কলমের শক্তিতে আলোকিত এক দিগন্ত
ইলম ও আমলে সমান পারদর্শী এই বিদ্বান ব্যক্তি কলমের জগতেও ছিলেন সক্রিয়। তাঁর রচনাগুলোতে রয়েছে ইলম, চিন্তা ও দিকনির্দেশনার অপূর্ব সমন্বয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ-
১. দুরুসুল লুগাতুল আরবিয়া (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)
২. আমার দেখা লন্ডন (ভ্রমণ কাহিনী)
৩. কওমি মাদরাসা: কী ও কেন?
৪. হাম কৌন হ্যায়? হমারি যিম্মাদারি কিয়া হ্যায়?
৫. তাযকিরায়ে-এ শাহ আলী আহমদ বোয়ালভী
৬. নিদাউল মানাবির (মিম্বরে আহ্বান)
৭. তামরীনুল মিজান ওয়াল মুনশাইব
বিদায়, কিন্তু শেষ নয়
মানুষ চলে যায়- এটাই নিয়ম। কিন্তু কিছু মানুষ এমন আছেন, যাঁরা চলে গিয়েও থেকে যান তাঁদের কর্মে, তাঁদের আদর্শে। মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.) তেমনই একজন। তাঁর রেখে যাওয়া আলো নিভে যায়নি; বরং তা ছড়িয়ে পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
জানাজা: সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আল-জামিয়া আল- ইসলামিয়া পটিয়া মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
দোয়া: আল্লাহ তা’আলা মরহুমকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, তাঁর সকল খেদমত কবুল করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী, ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের সবর করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার

