বর্তমান মুসলিম সমাজে বিজাতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের চরম ট্র্যাজেডিগুলোকেও আজ আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১লা এপ্রিল বা ‘এপ্রিল ফুল’ উদযাপন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ কৌতুক মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে স্পেনের মুসলিম নিধনের এক পৈশাচিক ও হৃদয়বিদারক ইতিহাস। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো সেই ধামাচাপা পড়া ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে উন্মোচন করা এবং মুসলিম উম্মাহকে নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ও পতনের কারণ সম্পর্কে সচেতন করা।
স্পেনে মুসলিম শাসনের সোনালী যুগ
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের অকুতোভয় নেতৃত্বে মাত্র বারো হাজার মর্দে মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে স্পেন জয় করেন। এই বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপের বুকে ইসলামের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। পরবর্তী দীর্ঘ আটশ বছর সেখানে মুসলিম শাসন বিদ্যমান ছিল, যা আধুনিক সভ্যতা, বিজ্ঞান ও দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। জ্ঞান বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছিল স্পেন। রাজকীয় আল-হামরা প্রাসাদ ও গ্রানাডা শহর আজও সেই মহান সভ্যতার নীরব সাক্ষী। তবে মুসলিম শাসকদের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যখনই মুসলিম শাসকরা ঈমানি শক্তি ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ভোগ-বিলাসিতা ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়েন, তখনই তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে।
পতনের নীল নকশা ও সম্মিলিত ষড়যন্ত্র
স্পেনের তৎকালীন মুসলিম শাসকরা দীর্ঘ সময় স্পেন শাসনের একপর্যায়ে নিজেরা নিজেদের সাথে অন্তর্দলীয় কোন্দলে আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিপরীতে বিভাজনের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। আর স্পেনের মুসলিমদের এ অনৈক্যের সুযোগ নেয় পরাজিত খ্রিষ্টান শক্তিগুলো। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, আরগন রাজ্যের রাজা ফার্ডিনান্ড ও কাস্তালিয়ার রানী ইসাবেলা মুসলিমদের সমূলে ধ্বংস করার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মুসলিমদেরকে পরাজিত করার অভিলাষে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর থেকেই তারা মুসলিমদের আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন অজুহাত খুঁজতে থাকে। অবশেষে এক সময় তারা সে সুযোগ পেয়েও যান এবং সম্মিলিত শক্তি নিয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করেন। মুসলিমরা তখন নিজেদের ভেতর আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তারা একের পর এক মুসলিম শহরগুলো আক্রমণ করতে থাকেন এবং জয় করতে করতে রাজধানী গ্রানাডার সামনে আসেন।
যেহেতু গ্রানাডা রাজধানী ছিল তাই সেটা এত সহজে জয় করা সম্ভব ছিল না। চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে ফার্ডিনান্ড বাহিনী রাজধানী গ্রানাডা অবরোধ করে। তারা সম্মুখ যুদ্ধে মুসলিমদের অপরাজেয় শক্তি সম্পর্কে অবগত ছিল, তাই তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। তারা শহরের বাইরে খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎস ‘ভেগা’ উপত্যকার শস্যখামারগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রানাডায় এক অবর্ণনীয় দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। (তথ্যসূত্র: মাসিক আত-তাহরীক, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা)
বিশ্বাসঘাতকতা ও ১লা এপ্রিলের গণহত্যা
যেহেতু মুসলিমরা সম্মুখ সমরে অপরাজেয় তাই খ্রিস্টান বাহিনী বিভিন্ন কূট কৌশল রচনা করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ অবরোধ ও শস্যাগার পুড়িয়ে দেয়ার কারণে খাদ্যাভাবে মুসলিমরা যখন চরম অসহায় হয়ে পড়ে, তখন রাজা ফার্ডিনান্ড এক ধূর্ত পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, যারা অস্ত্র ত্যাগ করে গ্রানাডার কেন্দ্রীয় মসজিদে এবং বন্দরে অপেক্ষমান জাহাজগুলোতে আশ্রয় নেবে, তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সাধারণ মুসলমানরা রাজা ফার্ডিনান্ড এর কৌশলগত এই ঘোষণা বিশ্বাস করে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় মসজিদে ও জাহাজে ভিড় জমায়।
অসহায় মুসলিমরা যখন অবরুদ্ধ হয়, তখন ফার্ডিনান্ড তার প্রকৃত নিষ্ঠুর রূপ উন্মোচন করেন। তিনি মসজিদের দরজায় তালা লাগিয়ে বাইরে থেকে অগ্নিসংযোগের নির্দেশ দেন। একইভাবে মাঝসাগরে নিয়ে জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুর গগন বিদারী আর্তনাদে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলেও সেদিন সেই পাষাণ হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হয়নি। আহ! কি সেই হৃদয়বিদারক মর্মস্পর্শী আর্তনাদ! ইতিহাসের সেই বীভৎস মুহূর্তে ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা উপহাস করে বলেছিল— “ঙয গঁংষরস, যড়ি ভড়ড়ষ ুড়ঁ ধৎব!” (হায় মুসলমান, তোমরা কত বড় বোকা!)
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও উম্মাহর শিক্ষা
এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটেছিল ১৪৯২ সালের ১লা এপ্রিল। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য বিশ্ব এই দিনটিকে ‘এপ্রিল ফুল’ বা ‘এপ্রিলের বোকা’ দিবস হিসেবে উদযাপনের প্রথা চালু করে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিম সমাজ স্বীয় ইতিহাসের এই রক্তরঞ্জিত পৃষ্ঠা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে বিজাতীয় এই অপসংস্কৃতিতে মেতে ওঠে। গ্রানাডার পতন কেবল শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড হারানো নয়, বরং এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর অনৈক্য এবং বিজাতীয় প্রলোভনের ফাঁদে পা দেওয়ার এক চূড়ান্ত ও করুণ পরিণতির দৃষ্টান্ত।
পরিশেষে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহর জন্য গ্রানাডার ইতিহাস এক বড় শিক্ষা। বিজাতীয় কৃষ্টি-কালচার কেবল বিনোদন নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা মুসলিমদের হীনম্মন্য ও ইতিহাসবিস্মৃত করার হাতিয়ার। সুতরাং, ১লা এপ্রিলের মতো বিতর্কিত ও বেদনাদায়ক ইতিহাসবাহী দিবস পালন করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। নিজেদের ঈমানি চেতনা পুনরুদ্ধার এবং হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। (তথ্যসূত্র: ১. মাসিক আত-তাহরীক, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা। ২. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিক)
লেখক: প্রাবন্ধিক
সালনা, গাজীপুর

