Logo

ধর্ম

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

ইসলামের আলোকে সহমর্মিতার আহ্বান

Icon

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০১

ইসলামের আলোকে সহমর্মিতার আহ্বান

প্রতিবছর ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০২৬” পালিত হয়। এই দিবসটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

বর্তমান বিশ্বে অটিজম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। অনেক পরিবার এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এটিকে “স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা” হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ইসলাম এই বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে- আখলাক, দয়া, ধৈর্য এবং সামাজিক দায়িত্বের আলোকে বিবেচনা করে। কোরআন ও হাদিসে এমন বহু দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

অটিজম: একটি বাস্তব ও মানবিক চিত্র

অটিজম বা আত্মকেন্দ্রিকতা জনিত বিকাশগত ভিন্নতা এমন একটি অবস্থা, যেখানে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ ও চিন্তায় ভিন্নতা দেখা যায়।

তাদের মধ্যে দেখা যেতে পারে- সামাজিক যোগাযোগে অসুবিধা, ভাষা ব্যবহারে বিলম্ব, একই কাজ বারবার করার প্রবণতা, সংবেদনশীলতার ভিন্নতা।

এটি কোনো শাস্তি বা অভিশাপ নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্ট বৈচিত্র্যের একটি অংশ। তাই তাদেরকে অবহেলা নয়, বরং মর্যাদা ও ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করা উচিত।

অটিজম আক্রান্ত অনেক শিশুর মধ্যেই বিশেষ প্রতিভা বা ভিন্নধর্মী দক্ষতা দেখা যায়- যা আমাদের জন্য চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তাই তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কোরআনের আলোকে মানবিকতা ও ভিন্নতার স্বীকৃতি

 ১. সৃষ্টির বৈচিত্র্য আল্লাহর নিদর্শন

“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সুন্দরতম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।- (সূরা আত-তীন:৪) এই আয়াত প্রমাণ করে, প্রতিটি মানুষই আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মানিত সৃষ্টি। ভিন্নতা থাকা মানেই অসম্পূর্ণতা নয়; বরং এটি আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য।

২. মানুষে মানুষে মর্যাদা।

নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।- (সূরা আল-ইসরা: ৭০) এই আয়াত মানবজাতির সার্বজনীন মর্যাদা ঘোষণা করে। অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরাও এই সম্মানের অংশীদার।

৩. দুর্বলদের প্রতি সদয় আচরণ।

তোমরা এতিমদের প্রতি কঠোর হয়ো না।- (সূরা আদ-দুহা ৯৩:৯)

“আর অভাবগ্রস্তদের ধমক দিও না।” — (সূরা আদ-দুহা:১০) এই নির্দেশনা সমাজের সব দুর্বল মানুষের জন্য প্রযোজ্য- অটিজম আক্রান্ত শিশুরাও এর অন্তর্ভুক্ত।

৪. সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব নয়।

“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।- (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬) এই আয়াত পরিবারগুলোকে আশা ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। এটি বুঝায় যে, আল্লাহ প্রতিটি অবস্থার প্রতি ন্যায়বিচার করেন।

৫. ধৈর্যশীলদের মর্যাদা।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।- (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)

৬. সহানুভূতির শিক্ষা।

“তোমরা পরস্পরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করো।- (সূরা আল-ফাতহ: ২৯, ভাবার্থ)

৭. কষ্টের পরেই স্বস্তি।

“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।- (সূরা আশ-শারহ: ৬) এই আয়াত বিশেষভাবে অটিজম আক্রান্ত শিশুর পরিবারকে আশা জোগায়- কষ্টের পরেই রয়েছে সহজতা ও পুরস্কার।

হাদিসের আলোকে দয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ব

১. দয়ার সর্বজনীনতা।

রাসুল (সা.) বলেছেন, যারা পৃথিবীতে দয়া করে, আসমানের মালিক তাদের প্রতি দয়া করেন।- (সুনান তিরমিজি: ১৯২৪)

২. দয়া না করলে দয়া পাওয়া যাবে না।

যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।- (সহিহ বুখারি: ৭৩৭৬)

৩. দুর্বলদের অধিকার।

“তোমরা দুর্বলদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।- (সুনান আবু দাউদ: ৫১৫২)

 ৪. শিশুদের প্রতি মমতা।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না। (সুনান তিরমিজি:১৯১৯)

৫. কষ্টের বিনিময়ে প্রতিদান।

“মুমিনের উপর যে কষ্টই আসে, তা তার গুনাহ মাফের কারণ হয়।” (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১)

৬. ধৈর্যের মর্যাদা।

“আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা যখন বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, আমি তাকে উত্তম প্রতিদান দিই।- (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

৭. সহজ করার নির্দেশ।

রাসুল (সা.) বলেছেন: তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, বিরক্ত করো না।- (সহিহ বুখারিল ৬৯) এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়- অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সাথে আচরণে সহজতা ও সহনশীলতা অবলম্বন করতে হবে।

অটিজম: অভিশাপ নয়, আল্লাহর পরীক্ষা

ইসলামে কোনো শিশুর বিশেষ অবস্থা কখনোই অভিশাপ নয়। বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের ঈমান যাচাই হয়, ধৈর্য ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময় নিষ্পাপ ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয়, যা আমাদের জন্য একটি শিক্ষা।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়

 ১. ভালোবাসা ও সম্মান।

তাদেরকে অবহেলা নয়, বরং মর্যাদা দিতে হবে।

২. সচেতনতা বৃদ্ধি।

অটিজম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে।

৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ।

শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

 ৪. অভিভাবকদের সহায়তা।

তাদের মানসিক শক্তি বাড়াতে হবে এবং পাশে দাঁড়াতে হবে।

 ৫. দক্ষতা বিকাশে সহায়তা।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ দক্ষতা চিহ্নিত করে তা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের তাৎপর্য

এই দিবস আমাদের শেখায়-

ভিন্নতা মানেই দুর্বলতা নয়

প্রতিটি মানুষ সম্মানের যোগ্য

সহমর্মিতা একটি সমাজের ভিত্তি

এটি একটি মানবিক জাগরণের দিন, যা আমাদের দায়িত্বশীল করে তোলে।

শেষ কথা: কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, অটিজম কোনো অভিশাপ নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরীক্ষা এবং রহমতের একটি মাধ্যমও হতে পারে।

আমাদের দায়িত্ব- তাদের ভালোবাসা ও সম্মান দেওয়া।তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- “ভিন্নতাকে সম্মান করি, মানবিকতাকে শক্তিশালী করি।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ, ধৈর্য এবং দায়িত্ব পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন। 

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন