Logo

ধর্ম

খুতুবি সংগ্রহ: সম্মানীর আবরণে প্রচ্ছন্ন অপমান

Icon

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১১

খুতুবি সংগ্রহ: সম্মানীর আবরণে প্রচ্ছন্ন অপমান

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ইসলামের দুটি মহান ও পবিত্র উৎসব, যা শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং ঈমান, ঐক্য ও তাকওয়ার এক অনন্য প্রকাশ। এই দুই দিনে মুসলিম উম্মাহ দলে দলে ঈদগাহে সমবেত হয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। ধনী-গরিব, বড়-ছোট, সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানোর এই দৃশ্য ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই নামাজের ইমামতি করেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যিনি শুধু নামাজ পরিচালনাই করেন না; বরং খুতবার মাধ্যমে মুসল্লিদের সামনে তুলে ধরেন ইসলামের দিকনির্দেশনা, নৈতিকতা ও সমাজসংস্কারের বার্তা।

ইমামতি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, এটি এক মহান আমানত। ইমাম হচ্ছেন জামাআতের রুহানি নেতা, যিনি মানুষের দ্বীনি জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি মুসল্লিদের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের ইবাদতকে শুদ্ধভাবে আদায়ে সহায়তা করেন এবং সমাজে ন্যায়, তাকওয়া ও আদর্শের বীজ বপন করেন। তাই এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন গভীর ইখলাস, তাকওয়া ও আত্মত্যাগ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এই পবিত্র দায়িত্বের সাথে এমন একটি প্রথা জড়িয়ে গেছে, যা ভাবনার উদ্রেক করে। ঈদের নামাজ শেষে ইমামের জন্য “খুতুবি” নামে অর্থ সংগ্রহ করার যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, তা খুবই দৃষ্টিকটু। এতে রয়েছে ইমামের মানহানি।

ঈদের নামাজে পর ইমামদের সম্মানজনকভাবে হাদিয়া দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। তা সম্মানজনক পদ্ধতিতে সম্পাদন করা সকলের উপর অবশ্য কর্তব্য। 

খুতুবির স্বরূপ

আমাদের সমাজে ঈদের খুতবা শেষে ইমামকে যে হাদিয়া দেয়া হয়, তাকে লোকজ ভাষায় “খুতুবি” বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রথাটি কেবল আমাদের সমাজে টিকেই নেই, বরং এটি একটি অবিচ্ছেদ্য লোকাচারে পরিণত হয়েছে। ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিদের মাঝে রুমাল-গামছা বা পাত্র দিয়ে “খুতুবি, খুতুবি...” ডাক উঠিয়ে তা সংগ্রহ করা হয়। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই কর্মটা এখন অবমাননাকর আচারে পর্যবসিত। যে ইমামকে সমাজ তার আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে মান্য করে, তাঁরই সম্মানী যখন জনসম্মুখে অনেকটা “ভিক্ষাবৃত্তির” আদলে সংগ্রহ করা হয়, তখন তা কেবল তাঁর ব্যক্তিত্বকেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে গোটা দেশের ইমামদেরকেই হেয় প্রতিপন্ন করে।

যা হওয়ার কথা ছিল প্রাপ্য হক বা পরম শ্রদ্ধার উপহার, তা আজ থালায় পড়ে থাকা খুচরো পয়সার মতো একপ্রকার দয়ার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আমাদের কর্তব্য ইমামদের এই অমর্যাদা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী আর্থিক কাঠামোর ভেতর নিয়ে আসা, যাতে সম্মানী শব্দটি তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পায়।

শ্রদ্ধার আবরণে প্রচ্ছন্ন অপমান

‘খুতুবি’ সংগ্রহের এই প্রচলিত পদ্ধতিটা কেন একজন ইমামের জন্য চরম মানহানিকর, তা গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:

উপস্থিতির বিড়ম্বনা ও প্রকাশ্য অসম্মান: ইমাম যখন সবেমাত্র খুতবার মতো একটি পবিত্র ও গুরুগাম্ভীর্যপূর্ণ দায়িত্ব শেষ করেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর চোখের সামনে অর্থ সংগ্রহের পাত্র বা রুমাল মেলে ধরা হয়। এটি কেবল অস্বস্তিকর নয়, বরং একজন আধ্যাত্মিক নেতার জন্য চরম লাজুকতার মুহূর্ত।

কল্পনা করুন, একজন সংসদ সদস্য (এমপি) বা চেয়ারম্যান যখন জনস্বার্থে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক মিটিং শেষ করে মঞ্চ থেকে নামছেন, ঠিক তখনই তাঁর সম্মানী বা যাতায়াত খরচ আদায়ের জন্য উপস্থিত জনতার সামনে থালা বা ঝুড়ি নিয়ে টাকা তোলা শুরু হলো। এটি যেমন সেই জনপ্রতিনিধির পদের জন্য চরম অবমাননাকর এবং একটি কুরুচিপূর্ণ দৃশ্য, একজন খতিবের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি সমান অপমানের।

ইলমে দ্বীনের অবমূল্যায়ন: ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী একজন ইমাম যিনি আলেম হয়ে থাকেন, তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি ‘ইলমে অহি’ তথা, ঐশী জ্ঞানের ধারক। রাসুল (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।” (সহিহ বুখারি: ৭১)। যখন একজন আলেমকে নামাজ শেষে প্রকাশ্য অর্থ সংগ্রহের দীর্ঘ সারির মুখোমুখি করা হয়, তখন মূলত সেই ঐশী জ্ঞানকেই তুচ্ছ করা হয়। সমাজ অজান্তেই তাঁকে এমন এক অবস্থানে নামিয়ে আনে, যা প্রকারান্তরে ভিক্ষাবৃত্তির সমতুল্য। দ্বীনি জ্ঞানের মশালবাহীকে এভাবে মানুষের করুণার পাত্রে পরিণত করা শরিয়াহ প্রদত্ত সম্মানের মানদণ্ডের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং দ্বীনের মর্যাদাহানির নামান্তর।

মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ববোধের সংঘাত: এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর পেছনে থাকা সামাজিক মনস্তত্ত্ব। থালা-ঝুড়ি বা রুমালে টাকা ফেলার এই পদ্ধতিটি মুসল্লিদের অবচেতনে একটি ‘দাতা-গ্রহীতা’র সম্পর্ক তৈরি করে। এতে ইমামের প্রাপ্য সম্মান ঢাকা পড়ে যায় “খুতুবি” নামের কথিত “দান”-এর আবরণে। মুসল্লিদের মনে তা এক ধরনের অলিখিত শ্রেষ্ঠত্ববোধ জন্ম দেয় এবং ইমামের মর্যাদা তাদের দৃষ্টিতে একজন কর্মচারীর চেয়েও নিচে নামিয়ে আনে। এটি ইমামের পেশাদারিত্বকে খর্ব করে এবং তাঁর সামাজিক কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করে দেয়। যে হাত খুতবার মিম্বরে বসে সমাজকে পথ দেখাবে, সেই হাতের সামনেই যখন অভাবের থালা ধরা হয়, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়।

শরঈ দৃষ্টিভঙ্গি

ইলমের মূল্য ও আলেমের সম্মান: ইসলাম আলেম ও ইমামদের সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুস্তর বৃদ্ধি করবেন।” (সুরা মুজাদালা: ১১)। তাই ইমামতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিকে এমনভাবে সম্মানি প্রদান করতে হবে, যা তাঁর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইমাম ইবনে কুদামা (রাহি.) বলেন, ইমামের সম্মানী প্রদান একটি ইসলামি দায়িত্ব এবং এটি এমনভাবে করা উচিত যেন ইমামের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সমাজের “খুতুবি” সংগ্রহ পদ্ধতি এই মূলনীতির পরিপন্থী।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: অন্যান্য পেশায় আমরা কী করি? আমরা কোন কর্মকর্তাকে তাঁর কাজের পরে প্রকাশ্যে থালা নিয়ে টাকা তুলতে দেখি না। একজন শিক্ষককে ক্লাসের পরে ছাত্রদের সামনে হাত পাতার পরিস্থিতিতে ফেলা হয় না। রায় প্রদানের পর একজন বিচারকের সামনে অর্থ সংগ্রহ করা হয় না। কিন্তু ধর্মীয় নেতা, যিনি কিনা আমাদের আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক, তাঁকে কেন এই অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে ফেলা হবে?

সমাধানের পথ: মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থা

সমস্যার সমাধান “খুতুবি” সংগ্রহ বন্ধ করা নয়, বরং এটিকে মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা।

পূর্বনির্ধারিত সম্মানী ও বাজেট প্রণয়ন: ঈদ আয়োজক কমিটির উচিত ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে খতিব বা ইমাম সাহেবের খুতবা ও ইমামতির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও সম্মানজনক সম্মানী নির্ধারণ করা। এটি কোনো মৌসুমি সাহায্য বা খুচরো সংগৃহীত অর্থ নয়, বরং তাঁর যোগ্যতা ও শ্রমের একটি স্বীকৃত হক। মসজিদ বা ঈদগাহের বার্ষিক বাজেট থেকেই এই অর্থ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন, যাতে করে জনসম্মুখে ‘হাতপাতা’র মতো কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টিই না হয়।

ব্যক্তিগত ও নিভৃত প্রদান রীতি: ইমাম সাহেবের সম্মানী বা হাদিয়া প্রদানের প্রক্রিয়াটি হতে হবে অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং মার্জিত। নামাজের আগে বা পরে কমিটির পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে একটি খামে ভরে এই সম্মানী তাঁর হাতে তুলে দেবেন। এটি কেবল একটি লেনদেন নয়, বরং এটি তাঁর প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি শিষ্টাচার। এতে করে একজন আলেমের আত্মমর্যাদা অটুট থাকে এবং তিনি নিজেকে সমাজের বোঝা মনে না করে একজন সম্মানিত পথপ্রদর্শক হিসেবে অনুভব করেন।

সম্মানের পুনরুদ্ধারই হোক আমাদের অঙ্গীকার

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে এমন প্রতিটি পরিস্থিতি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন, যেখানে একজন আলেমের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা থাকত। তিনি বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন: “আলেমের সম্মানই দ্বীনের সম্মান।” আজ আমাদের উত্তরসূরি হিসেবে সেই মহান দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

‘খুতুবি’ সংগ্রহের এই দীর্ঘদিনের প্রথাটি হয়ত শুরু হয়েছিল এক সদিচ্ছা থেকে, কিন্তু এর বর্তমান পদ্ধতিটি চরমভাবে অসম্মানজনক। এটি কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা এবং আলেম সমাজের প্রতি আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির এক নেতিবাচক প্রতিফলন। একটি সমাজ তার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতাদের সাথে কীরূপ আচরণ করে, সেটিই মূলত সেই সমাজের সভ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: “যে, কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া বা আল্লাহভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।” (সুরা হজ: ৩২)

ইমাম ও উলামায়ে কেরাম হলেন জমিনে আল্লাহর দ্বীনের জীবন্ত নিদর্শন। তাঁদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং আমাদের ঈমানের দাবি এবং নৈতিক দায়িত্ব।

তাই আজ সময় এসেছে এই অবমাননাকর প্রথাটি আমূল সংস্কার করার। মসজিদ কমিটি, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং সচেতন মুসল্লিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইমামদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ সম্মানীর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আলেমদের সম্মান রক্ষা করা মানেই ইসলামের সুমহান ঐতিহ্যকে রক্ষা করা। এই পরিবর্তন কেবল একটি দাবি নয়, বরং একটি সুস্থ ও ইনসাফপূর্ণ সমাজের জন্য অপরিহার্য শর্ত।

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন