Logo

ধর্ম

পবিত্র কোরআনের বিশেষত্ব

Icon

মুহাম্মাদ মুহিব্বুল্লাহ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৪

পবিত্র কোরআনের বিশেষত্ব

প্রথম মানব ও নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। পথনির্দেশিকা বা গাইডবুক হিসেবে তাঁদের ওপর অবতীর্ণ করেছেন সহিফা ও কিতাব। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয় মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ—কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির হেদায়েতের আলোকবার্তিকা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ সেই কিতাব, যাতে কোনোই সন্দেহ নেই; পথপ্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য—যারা অদেখা বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের ওপর, যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে; আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।’ (সুরা বাকারা: ২–৪)

পবিত্র কোরআন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সংবিধান। কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে এ কোরআনে। কোরআনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনকারীদের জন্য রয়েছে বাড়তি ফজিলত ও মর্যাদার ঘোষণা। এ প্রসঙ্গে হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ৪৭৩৯)

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিছু লোক আল্লাহর পরিজন।’ সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কারা? তিনি বলেন, ‘কোরআন তিলাওয়াতকারীরা আল্লাহর পরিজন এবং তাঁর বিশেষ বান্দা।’ (ইবনে মাজাহ: ২১৫)

কোরআন শরিফ পাঠ করলে প্রতিটি হরফের বিনিময়ে দশটি করে সওয়াব পাওয়া যায়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করল, সে দশটি সওয়াবের অধিকারী হলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না—“আলিফ-লাম-মীম” একটিই হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৯১০)

কোরআন তিলাওয়াতকারীর পাশাপাশি তার মাতাপিতা ও পরিবারের লোকজনও এর উপকারিতা ও সুফল ভোগ করে থাকে। হজরত মুয়াজ জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করেছে এবং তাতে যা আছে সে অনুযায়ী আমল করেছে, তাহলে তার মা-বাবাকে হাশরের মাঠে একটি নূরের মুকুট পরানো হবে। যদি সূর্য তোমাদের ঘরে প্রবেশ করত, তাহলে ওই সূর্যের আলোর চেয়েও মুকুটের আলো বেশি উজ্জ্বল হবে। এখন তোমরা চিন্তা কর, যে ব্যক্তি কোরআনের নির্দেশ অনুসারে আমল করে, তার মর্যাদা ও অবস্থান কত উত্তম হবে!’ (আবু দাউদ: ১৪৫৩)

জীবনে চলার পথে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মানুষ ছোট-বড় অনেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব অন্যায়-অপরাধ তার বাহ্যিক অবস্থার পাশাপাশি আভ্যন্তরীণ অবস্থাকেও পরিবর্তন করতে থাকে। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.) এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে; তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরাটি হলো কলব।’ (সহিহ বুখারি: ৫০)

অন্যায়-অপরাধ ও গোনাহকে অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানুষ যখন অপরাধ করে এবং গোনাহে লিপ্ত হয়, তখন তার কলব কলুষিত হতে থাকে। গোনাহে লিপ্ত হওয়ার ধারাবাহিকতায় কলব একসময় কুৎসিত রূপ ধারণ করে। এমন কলবের অধিকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ চতুষ্পদ প্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের অন্তর রয়েছে, তবে তা দ্বারা বিবেচনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, তা দ্বারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।’ (সুরা আরাফ: ১৭৯)

গোনাহের কারণে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কলুষিত হৃদয়কে আলোকিত করতে প্রয়োজন ‘জিকরুল্লাহ’, অর্থাৎ অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করা। আর আল্লাহকে স্মরণ করার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত। কোরআনের রয়েছে অভাবনীয় শক্তি ও প্রভাব। এর পঠন ও শ্রবণে রয়েছে এক অন্যরকম ভালো লাগা, স্বর্গীয় সুখ ও আত্মিক প্রশান্তি। কঠোর হৃদয়ও এর সান্নিধ্যে এসে মুহূর্তেই বিগলিত ও কোমল হয়ে যায়।

আল্লাহর পক্ষ থেকে যত কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, কেবল কোরআন শরিফ ব্যতীত প্রত্যেকটির মধ্যেই পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটেছে। কিন্তু কোরআনের সংরক্ষণ ও ত্রুটিমুক্ত রাখার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেছেন। এটি পবিত্র কোরআনের অন্যতম বিশেষত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই এ উপদেশগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।’ (সুরা হিজর: ৯)

পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের ফজিলত, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কথা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি এর প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা ও অসম্মান প্রদর্শনকারীর ব্যাপারেও কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ (কোরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।’ (সুরা তোয়া-হা: ১২৪)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে দুনিয়ার জীবনে সংকটাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি কিয়ামতের দিনও মহাবিপদের সম্মুখীন হবে। কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বিভিন্নভাবে হতে পারে—যেমন: কোরআন তিলাওয়াত না করা, কোরআন শেখার চেষ্টা না করা, ভুলভাবে পাঠ করা, অক্ষরসমূহের অশুদ্ধ উচ্চারণ করা, শুদ্ধভাবে পড়লেও উদাসীনতা বা অযত্নসহকারে পাঠ করা, জাগতিক অর্থ ও সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে পাঠ করা, কোরআন শেখার পর তা ভুলে যাওয়া।

এমনিভাবে কোরআনের বিধানাবলী বোঝার চেষ্টা না করাও কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার শামিল। বোঝার পর তা আমলে না আনা, কিংবা বিরুদ্ধাচরণ ও অসম্মান প্রদর্শন করা—এগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। মোটকথা, কোরআনের হকের ব্যাপারে বেপরোয়া হওয়া একটি গুরুতর গোনাহ। কিয়ামতের দিন এই গোনাহের বোঝা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

muhibbullah472@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন