Logo

ধর্ম

ইসলামের আলোকে আদর্শ পরিবার

Icon

ইফতেখারুল হক হাসনাইন

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৪

ইসলামের আলোকে আদর্শ পরিবার

পারিবারিক অশান্তি আজ সমাজের এক গভীর ব্যাধি। তা মানুষের অন্তরের শান্তি কেড়ে নেয়, মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়। যে ঘরে শান্তি নেই, সেখানে আশার আলোও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। অথচ পরিবারই মানুষের প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিদ্যালয় এবং জীবনের প্রথম প্রশান্তির স্থান।

একটি সুখী ও স্থিতিশীল পরিবার গঠনের জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতার চর্চা অপরিহার্য। এর মূলে রয়েছে স্বামী ও স্ত্রীর নিজ নিজ অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং সেগুলোর যথাযথ পালন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এই সম্পর্কের নীতিমালা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সমাজে অনেকেই এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে, যা পারিবারিক অশান্তির অন্যতম কারণ।

স্বামীর দায়িত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা

ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি সদয়, নম্র ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করো, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (সুরা নিসা: ১৯)

এই আয়াতে নারীর প্রতি সদাচরণ, ধৈর্য এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো বিষয়ে রাগ বা কঠোরতার পরিবর্তে স্বামীর উচিত স্ত্রীর ভরণপোষণ, মানসিক শান্তি এবং সম্মানের প্রতি যত্নশীল হওয়া। সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং পুরুষরা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।’

এই নেতৃত্ব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভালোবাসা ও ন্যায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত। যদি স্ত্রীর কোনো আচরণে সমস্যা দেখা দেয়, তবে কোরআন উপদেশ, সাময়িক দূরত্ব এবং সংশোধনের জন্য পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপের কথা বলে; কিন্তু অত্যাচার বা জুলুমের অনুমতি দেয় না।

নবীর (সা.) আদর্শ জীবন

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সম্মানের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি গৃহস্থালির কাজে সহায়তা করতেন, স্ত্রীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটাতেন এবং সব পরিস্থিতিতে ন্যায় ও দয়া প্রদর্শন করতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

হজরত খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালের পরও তিনি তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর আত্মীয়দের প্রতি সদয় ব্যবহার অব্যাহত রাখতেন। এই আদর্শ পারিবারিক সম্পর্কে স্থিতি ও কোমলতা আনে।

স্ত্রীর দায়িত্ব ও ভূমিকা

নারীরও পারিবারিক শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে সদাচরণ, তার সম্মান, সম্পদ ও ইজ্জতের হেফাজত এবং বৈধ চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা স্ত্রীর দায়িত্ব। হাদিসে এসেছে, ‘যদি আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা জায়েজ হতো, তবে নারীকে তার স্বামীকে সিজদা করতে বলা হতো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৪০)

এটি স্বামীর প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব বোঝায়। স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়া, তার অনুমতি নিয়ে নফল ইবাদত করা এবং তার অপছন্দের ব্যক্তিদের ঘরে প্রবেশ না করানো—এসব ইসলামের নির্দেশনা। তবে সমাজে কিছু নারী স্বামীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তার সম্পদের অপচয় করে বা তার অপছন্দের সম্পর্ক বাড়ায়, যা পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উম্মাহাতুল মু’মিনীন এবং হজরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা পারিবারিক জীবনে আদর্শ স্ত্রীর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁরা স্বামীর সন্তুষ্টি ও পারিবারিক সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন এবং শিক্ষার মাধ্যমে উম্মতের জন্যও কাজ করেছেন। হজরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা হজরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে জীবনভর সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করেছেন এবং হজরত হাসান ও হজরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান সন্তানদের প্রতিপালন করেছেন। তাঁদের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—পারিবারিক শান্তি সমাজের স্থিতির মূল ভিত্তি।

পারিবারিক সম্পর্কের প্রভাব

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পরিবারের মূল স্তম্ভ। পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও বোঝাপড়া সন্তানদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। শান্তিপূর্ণ পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। বিপরীতে, কলহপূর্ণ পরিবেশ সন্তানদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, অবাধ্যতা ও স্বার্থপরতার প্রবণতা সৃষ্টি করে।

পুরুষ ও নারী পরিবার নামক গাড়ির দুটি চাকা। একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ, সম্মান ও ভালোবাসা থাকলে পরিবারে শান্তি নেমে আসে, যা সমাজের স্থিতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। ইসলামের শিক্ষা ও নবীর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। এই শান্তিপূর্ণ পরিবারই সমাজের উন্নতি ও মঙ্গলের চাবিকাঠি।

লেখক: প্রাবন্ধিক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন