Logo

ধর্ম

মহিলাদের পোশাকের স্বাতন্ত্র

Icon

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪

মহিলাদের পোশাকের স্বাতন্ত্র

সৃষ্টিকূলের মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বাহ্যিক প্রকাশ হলো পোশাক। পোশাক শুধু দেহ আবৃত করার মাধ্যম নয়; এটি ব্যক্তিত্ব, রুচি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধেরও প্রতিচ্ছবি। মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে দুই ভিন্ন সত্তায় সৃষ্টি করেছেন- পুরুষ ও নারী। উভয়ের মাঝে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু স্বাভাবিক ও সৃষ্টিগত পার্থক্য। এই পার্থক্যই মানব সমাজে ভারসাম্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করে।

নারী ও পুরুষের মাঝে দৈহিক গঠন, মানসিক প্রবণতা, চালচলন, দায়িত্ববোধ ও কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভিন্নতা বিদ্যমান। এই ভিন্নতা কোনো বৈষম্য নয়; বরং এটি আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। সমাজের সুস্থতা, পরিবারব্যবস্থার স্থিতি এবং মানবজাতির টিকে থাকার জন্য এই স্বাভাবিক পার্থক্য অপরিহার্য।

পোশাক মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একজন মানুষ যেমন পোশাক পরিধান করে, তার আচরণ, আত্মপরিচয় ও জীবনদৃষ্টিও সেভাবে গড়ে ওঠে। যখন নারী তার স্বাভাবিক স্বকীয়তা ভুলে পুরুষের অনুকরণে পোশাক, চালচলন ও জীবনধারা গ্রহণ করতে থাকে, তখন তার মাঝে ধীরে ধীরে পুরুষালী ভাবের বিকাশ ঘটে। এক পর্যায়ে সে নিজস্ব নারীত্বকে অবমূল্যায়ন করতে শুরু করে। একইভাবে পুরুষও যদি নারীর অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে তার মধ্যেও স্বাভাবিক পুরুষত্ব ক্ষীণ হয়ে যায়।

এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই ক্ষতিকর নয়; বরং এটি সমাজের সামগ্রিক কাঠামো ও মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ। কারণ, প্রকৃতির নির্ধারিত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে সামাজিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়।

ইসলাম এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে নারী ও পুরুষের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ইসলাম নারী-পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার শিক্ষা দেয়। এ কারণেই শরিয়তে পোশাক, আচরণ ও জীবনধারায় স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।

হাদিস শরিফে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, “যে পুরুষ নারীদের মতো বা নারীদের পদ্ধতিতে পোশাক পরিধান করে এবং যে নারী পুরুষদের মতো বা পুরুষদের পদ্ধতিতে পোশাক পরিধান করে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের উপর লানত করেছেন।” (আবু দাউদ: ৪০৯৮)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনু আবি মুলাইকা (রহ.) বলেন, উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- মহিলারা কি পুরুষদের মতো স্যান্ডেল পরতে পারবে? উত্তরে তিনি বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষালি চলনের নারীদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন।”

এসব হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ইসলাম নারী-পুরুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় সংরক্ষণে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে। এখানে কাউকে হেয় করা উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রত্যেককে তার নিজস্ব মর্যাদা ও স্বকীয়তার সম্মান দেওয়া লক্ষণীয়।

নারীর পোশাক হওয়া উচিত শালীন, পর্দাসম্মত ও তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি তাকে সম্মানিত করে, নিরাপত্তা দেয় এবং সমাজে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করে। অন্যদিকে পুরুষের জন্যও তার উপযোগী পোশাক ও আচরণ নির্ধারিত হয়েছে, যা তাকে দায়িত্বশীল ও দৃঢ়চেতা করে তোলে।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে সংস্কৃতির মিশ্রণ ও অন্ধ অনুকরণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে এই স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। মিডিয়া, ফ্যাশন ও সামাজিক প্রবণতা অনেক সময় মানুষকে নিজের স্বকীয়তা ভুলে যেতে প্রলুব্ধ করে। এমন বাস্তবতায় মুসলিম সমাজের উচিত সচেতন হওয়া এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য অটুট রাখা।

পোশাক শুধু বাহ্যিক আবরণ নয়- এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। নারী তার নারীত্বে, পুরুষ তার পুরুষতে-এই স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্যেই মানবজীবনের পূর্ণতা নিহিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এই স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা কেবল একটি বিধান নয়; বরং এটি একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম সহযোগী।

লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদরাসা, নিউ ইস্কাটন ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন