Logo

ধর্ম

কওমিতে ইলমী ইনহিতাত ও অবক্ষয়

আত্মসমালোচনার সময় এখনই

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৭

আত্মসমালোচনার সময় এখনই

কওমি মাদরাসা উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে দ্বীনি শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যুগের পর যুগ ধরে এই ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামি জ্ঞানচর্চা, আলেম তৈরী এবং সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থায় ইলমী অবক্ষয় (ইনহিতাত) নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাস্তবতা হলো—এই সংকট এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

ভাষা ও জ্ঞানচর্চায় বিচ্যুতি

বর্তমানে অনেক কওমি, বিশেষত বালিকা মাদরাসায়, উর্দু-ফার্সি শরহ বা মূল কিতাব পাঠের চর্চা প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। আরবি ভাষায় রচিত হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরের মৌলিক গ্রন্থের পরিবর্তে বাংলা অনুবাদনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা বাড়ছে। এতে শিক্ষার্থীরা মূল উৎস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে।

নোট-গাইড নির্ভরতা ও মেধাতালিকার প্রতিযোগিতা

একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো- নোট ও গাইডনির্ভর পড়াশোনা। অনেক শিক্ষার্থী বোর্ড পরীক্ষার মেধাতালিকায় স্থান পাওয়ার নেশায় প্রকৃত ‘তালেবে ইলম’ হওয়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর থেকেই অনেকের দরসে অনাগ্রহ দেখা যায়; তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল।

মাদরাসাগুলোর মধ্যেও কে কত বেশি “মেধাতালিকায় স্থান” পেল-এ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। এতে শিক্ষা হয়ে উঠছে সংখ্যার খেলা, অথচ ইলমের প্রকৃত উদ্দেশ্য- গভীর অনুধাবন (তাফাক্কুহ ফিদ্দীন)- পিছিয়ে পড়ছে।

স্বীকৃতি, সনদ ও বাস্তবতার প্রশ্ন

সরকারি স্বীকৃতি অর্জনের পর থেকে অনেক মাদরাসায় পাঠ্যপদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বাংলা নোট-গাইডের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যদি নোট-গাইড নির্ভর হয়ে সনদ অর্জনই লক্ষ্য হয়, তাহলে আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার সমালোচনা করার যৌক্তিকতা কোথায়?

প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী তথাকথিত “মাস্টার্স” সনদ অর্জন করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে গবেষক (মুহাক্কিক) বা রব্বানী আলেম হিসেবে গড়ে উঠছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ

শিক্ষকদের একটি অংশও নোট-নির্ভর পাঠদানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মোবাইল ডিভাইসে অনুবাদ দেখে ক্লাস নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার অমনোযোগ ও শিক্ষাবিমুখতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে হিফজ ও প্রাথমিক স্তরে এর প্রভাব মারাত্মক।

আত্মসমালোচনা ও করণীয়

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আন্তরিক আত্মসমালোচনা এবং কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ।

* মূল আরবি কিতাব ও শরহ পাঠে গুরুত্ব ফিরিয়ে আনা।

* নোট-গাইড নির্ভরতা কমিয়ে গভীর অধ্যয়ন (মুতালাআ) জোরদার করা

শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি।

* ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল করা।

* মেধাতালিকা ও সনদের চেয়ে জ্ঞানার্জনের মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তালেবে ইলম নবীজীর ইলমী মেহমান- এই চেতনা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। মাদরাসার সম্পদ ও আমানত রক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হক আদায় এবং ইলমকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি।

যদি আমরা সত্যিই দারুল উলূম দেওবন্দের অনুসারী দাবি করি, তবে আমাদেরকে ইলমের সেই বিশুদ্ধ ধারায় ফিরে যেতে হবে- যেখানে আন্তরিকতা, ত্যাগ ও গভীর জ্ঞানচর্চা ছিল মূল ভিত্তি। অন্যথায়, ইলমী ইনহিতাত ও অবক্ষয় থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে- এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে এর পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ পথে ফিরে আসার তাওফিক দান করুন।

লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক

পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন