একজন সন্তানকে হাফেজে কোরআন বা দ্বীনের আলেম হিসেবে গড়ে তোলা কেবল একটি পারিবারিক গৌরবের বিষয় নয়; বরং এটি একটি আমানত, একটি ইবাদত এবং পরকালের জন্য স্থায়ী সাদাকায়ে জারিয়ার উৎস। তবে এই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলেন অভিভাবকগণ। তাই সন্তানকে সত্যিকারের হাফেজ, আলেম বানাতে অভিভাবকগণকেও ধাপে ধাপে কিছু মৌলিক বিষয় মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
১. নিয়ত পরিশুদ্ধ হওয়া
সন্তানকে হাফেজ বা আলেম বানানোর প্রথম শর্ত হলো অভিভাবকের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া। যদি উদ্দেশ্য হয় সমাজে সম্মান পাওয়া, লোক দেখানো বা পার্থিব কোনো স্বার্থ অর্জন করা—তবে সেই প্রচেষ্টা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। বরং নিয়ত হতে হবে একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দ্বীনের খেদমত করা। বিশুদ্ধ নিয়ত থাকলে আল্লাহ তাআলা সেই পথে বরকত দান করেন এবং কাজকে সহজ করে দেন।
২. উপার্জন হালাল হওয়া
সন্তানের দ্বীনী শিক্ষার ক্ষেত্রে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। হারাম উপার্জনের প্রভাব সন্তানের উপর নেতিবাচকভাবে পড়ে। কখনো দেখা যায় ভালো প্রতিষ্ঠান, ভালো শিক্ষক পেয়ে সন্তান খুব ভালো পড়াশোনা করছিল। কিন্তু হঠাৎ সব এলোমেলো হয়ে যায়। অলসতা বা শয়তানি তার মাথায় চেপে বসে। এক পর্যায়ে সে বিগড়ে যায়। এর পিছে মূলত অভিভাবকের হারাম উপার্জনের বড় একটি প্রভাব থাকে- এমন ঘটনা একটি দুটি নয়; বরং শত শত। অপরদিকে হালাল রিজিক সন্তানের অন্তরে নূর সৃষ্টি করে এবং দ্বীনের পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করে। দেখা যায়- গরীব মানুষ কিন্তু তার সন্তানেরা যোগ্য থেকে যোগ্য হাফেজ, আলেম হচ্ছে। এমন উদাহরণও ভুরি ভুরি। তাই সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ করতে অভিভাবকদের উচিত নিজের আয়ের উৎসকে সম্পূর্ণরূপে হালাল রাখা।
৩. অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করা
অভিভাবকদের সব বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর না করে অভিজ্ঞ আলেম-উলামাদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। তারা সন্তানের যোগ্যতা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। এতে করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সন্তান সঠিক পথে পরিচালিত হয়। অনেক অভিভাবককে দেখা যায়, সন্তানের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্ত এবং চিন্তা অনুযায়ী চলার কারণে ভুল পথে চলে যান অথবা কমপক্ষে আশানুরূপ ভালো ফল পান না।
৪. সন্তানের সঠিক বয়সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
সন্তানকে হাফেজ বা আলেম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মাদরাসায় ভর্তির সময় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ না করে নিজস্ব ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ফলে কখনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, কখনো বা শিক্ষাবর্ষের সময় নির্ধারণে ভুল হয়ে যায়। আর এর প্রভাব সন্তানের উপর পড়ে এবং সে তার স্বাভাবিক মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তাই এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো বা শৈথিল্য না করে অভিজ্ঞ আলেম, শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ করে সন্তানের জন্য উপযুক্ত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
৫. ঘরে দ্বীনদার পরিবেশ তৈরি করা
সন্তানের চরিত্র গঠন ও দ্বীনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। যে ঘরে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়, কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যায় ও দ্বীনদারীর চর্চা থাকে- সেই পরিবেশে সন্তান খুব স্বাভাবিকভাবেই দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে এবং তা তার জীবনের অংশে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, যে ঘরে অশ্লীলতা, টিভি-সিনেমা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাধান্য থাকে, সেখানে সন্তানের জন্য দ্বীনের পথে অবিচল থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সাধারণ অভিভাবক সন্তানকে আলেম বানাতে চান, ভালো মাদরাসা নির্বাচন করেন এবং কষ্ট করে সেখানে ভর্তিও করান। কিন্তু ঘরের পরিবেশ দ্বীনমুখী না হওয়ায় সন্তান বাইরে থেকে অর্জিত শিক্ষা ধরে রাখতে পারে না; বরং ধীরে ধীরে সে বিপথে চলে যেতে পারে।
ফলশ্রুতিতে এক সময় মা-বাবা ও সন্তান উভয়েই হতাশ হয়ে পড়েন এবং সন্তানের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দোষারোপ করতে থাকেন। অথচ প্রকৃত সমস্যা ছিল ঘরের পরিবেশেই।
৬. আলেম-উলামাদের সম্মান করা
সন্তানকে হাফেজ, আলেম বানাতে আলেম-উলামাদের সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রভাবে সন্তানের অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মায় এবং সে নিজেও আলেম হওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়। এর বিপরীতে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক নিজ সন্তানকে হাফেজ-আলেম বানাতে চান, কিন্তু হাফেজ আলেমের গীবত শেকায়েত এবং অসম্মানে তার হৃদয় কলুষিত থাকে। সত্যি বলতে এর প্রভাব পুরোটাই তার সন্তানের উপর পড়ে। মনে রাখতে হবে, যারা দ্বীনের খেদমত করেন, তাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত গঠনে বড় সহায়ক।
৭. দ্বীন শেখাতে খরচে কার্পণ্য না করা
সন্তানের দ্বীনী শিক্ষার জন্য ব্যয় করাকে কখনোই অপচয় মনে করা উচিত নয়। বরং এটি একটি বিনিয়োগ, যার প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই পাওয়া যাবে। ভালো মাদরাসা নির্বাচন, প্রয়োজনীয় বইপত্র, পোশাক ও অন্যান্য খরচে উদার হওয়া উচিত। অনেক অভিভাবককে দেখা যায় সন্তানের জেনারেলের পড়াশোনায় খুব খরচ করেন। সেখানে ব্যয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কিন্তু এর বিপরীতে মাদরাসায় পড়াতে গেলেই খরচে কার্পন্য করতে পিছপা হন না। এটাকে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি অবহেলা ছাড়া অন্য আর বলা যেতে পারে!
৮. পড়াশোনার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা
অনেক অভিভাবক সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেন। এটি একটি ভুল ধারণা। সন্তানের পড়াশোনা, হিফজ বা কিতাব বিভাগের প্রতিটি জামাতের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা জরুরি। শিক্ষকগণের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং সন্তানের সমস্যাগুলো সমাধান করার চেষ্টা করা অভিভাবকের দায়িত্ব। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান কয় পারা পড়ল বা এ বছর কোন জামাতে পড়ে, কী কী কিতাব পড়ে-এসব বিষয়ে অভিভাবকগণ পুরোই অজ্ঞ থাকেন। এটাও সন্তানের শিক্ষার প্রতি অবহেলার একটি বড় পরিচয়, যা সচেতন অভিভাবকের ক্ষেত্রে মোটেই কাম্য নয়।
৯. সন্তানের উস্তাদকে সম্মান করা
সন্তানকে প্রকৃত অর্থে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তার উস্তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উস্তাদ কেবল একজন শিক্ষক নন; তিনি সন্তানের চরিত্র, আদর্শ ও জীবনের দিকনির্দেশনা গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর।
দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, কিছু অভিভাবক সন্তানের উস্তাদের সাথে প্রাপ্য সম্মান বজায় রেখে কথা বলেন না; বরং আর্থিক সামর্থ্যের প্রভাবে অনেক সময় তাদের সাথে একজন কেয়ারটেকারের মতো আচরণ করেন। তারা মনে করেন, অর্থের বিনিময়ে সন্তানকে পড়াচ্ছেন, তাই ইচ্ছামতো আচরণ করাই স্বাভাবিক। অথচ এই মনোভাবই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একটু ভেবে দেখুন- যে শিক্ষার মাধ্যমেই আপনি আপনার সন্তানকে গড়ে তুলতে চান, সেই শিক্ষার বাহক অর্থাৎ উস্তাদকেই যদি আপনি সম্মান দিতে না পারেন, তাহলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আপনার সন্তান কীভাবে সম্মানিত হবে?
১০. ছুটিতে আমলের প্রতি খেয়াল রাখা
মাদরাসা থেকে ছুটিতে বাড়িতে আসলে অনেক সময় সন্তান পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে ইবাদতে গাফেল হয়ে পড়ে। তাই এ সময় অভিভাবকদের উচিত সন্তানের নামাজ, তিলাওয়াত ও অন্যান্য আমলের প্রতি বিশেষ নজর রাখা। প্রয়োজনে তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং সঠিকভাবে গাইড করা।
হতে পারে অভিভাবকগণের সামান্য গাফলত তার এতদিন নূরানী পরিবেশে থেকে অর্জিত আমলকে শেষ করে দিবে। ক্ষেত্র বিশেষ তাকে বিপথগামী হতে সুযোগ তৈরি করে দিবে। আল্লাহ হেফাজত করুন।
১১. অহেতুক অহংকার থেকে বিরত থাকা
সন্তান ভালো পড়াশোনা করলে বা হাফেজ-আলেম হলে অনেক সময় অভিভাবকদের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি বিষয়। কারণ অহংকার আমলকে নষ্ট করে দেয়। বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং বিনয়ী হওয়া উচিত।
১২. সন্তানের জন্য নিয়মিত দুআ করা
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তানের জন্য মা-বাবার দুআ। সন্তানের হিদায়াত, ইলমে বরকত এবং আমলে উন্নতির জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে দুআ করা উচিত। কারণ মানুষের চেষ্টা সীমিত, কিন্তু আল্লাহর সাহায্য সীমাহীন। দুআই পারে একজন সন্তানকে সত্যিকার অর্থে দ্বীনের খাদেম হিসেবে গড়ে তুলতে।
মনে রাখবেন, সন্তানকে হাফেজ বা আলেম বানানো একটি সাধারণ ব্যাপার নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আত্মিক ও নৈতিক গঠনপ্রক্রিয়া। এতে যেমন সন্তানের পরিশ্রম প্রয়োজন, তেমনি অভিভাবকের আন্তরিকতা, ত্যাগ ও সঠিক দিকনির্দেশনাও অপরিহার্য। যদি অভিভাবকগণ উপরোক্ত বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে মেনে চলেন, তবে তাদের সন্তানরা শুধু হাফেজ বা আলেমই হবে না, বরং সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক: পরিচালক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

