Logo

ধর্ম

দুনিয়ার ভালোবাসা বনাম আল্লাহর ভালোবাসা

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩৮

দুনিয়ার ভালোবাসা বনাম আল্লাহর ভালোবাসা

মানুষ ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে পারে না। জন্মের পর মায়ের স্নেহ, বড় হলে বন্ধু-স্বজনের টান, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে প্রিয়জনের ভালোবাসা- এসবই মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়- এই ভালোবাসাগুলো কতটা স্থায়ী? কতটা নিঃস্বার্থ? আর কতটা আমাদের অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে?

বাস্তবতা হলো, দুনিয়ার ভালোবাসা অনেক সময় স্বার্থ, আবেগ ও পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল। সময়ের সাথে সাথে তা বদলে যায়, কমে যায়, এমনকি কখনো শেষও হয়ে যায়। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে এক অনন্য ভালোবাসা-মহান আল্লাহর ভালোবাসা। এই ভালোবাসা কখনো কমে না, ভেঙে যায় না, বরং বান্দা যতই দূরে যাক, আল্লাহ ততই তাকে কাছে টানেন।

দুনিয়ার ভালোবাসা: শর্তসাপেক্ষ ও ক্ষণস্থায়ী

দুনিয়ার মানুষ সাধারণত তখনই ভালোবাসে, যখন তার কোনো স্বার্থ পূরণ হয়। কেউ উপকার করলে আমরা তাকে ভালোবাসি, কিন্তু সে উপকার বন্ধ করলে সম্পর্কেও ফাটল ধরে। অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার কিংবা সামান্য কারণে সম্পর্ক ভেঙে যায়।

মানুষের ভালোবাসায় থাকে প্রত্যাশা- প্রতিদান, স্বীকৃতি, গুরুত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তাই এই ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না সবসময়। কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যায়, কেউ প্রতারণা করে, কেউ ভুলে যায়। ফলে মানুষের হৃদয়ে থেকে যায় অপূর্ণতা ও কষ্ট।

আল্লাহর ভালোবাসা: নিঃস্বার্থ ও চিরস্থায়ী

অন্যদিকে আল্লাহর ভালোবাসা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনো শর্তে বাঁধা নয়, বরং বান্দার কল্যাণের জন্যই সর্বদা উন্মুক্ত। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা : ১৯৫) আল্লাহ এমন এক সত্তা, যিনি বান্দার সামান্য ভালো কাজকেও বড় করে দেখেন। বান্দা এক কদম এগিয়ে এলে তিনি দশ কদম এগিয়ে আসেন। এই ভালোবাসা এমন, যা কখনো প্রতারণা করে না, কখনো হতাশ করে না।

মানুষ ভুলে যায়, আল্লাহ অপেক্ষা করেন

মানুষের ভালোবাসার বড় একটি দুর্বলতা হলো- ভুলে যাওয়া। সময়ের সাথে সাথে মানুষ একে অপরকে ভুলে যায়, দূরে সরে যায়। কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে ভুলে যান না। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।- (সূরা আল-বাকারা: ২২২) বান্দা গুনাহ করে দূরে সরে গেলেও আল্লাহ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। সে যখন অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে শুধু ক্ষমাই করেন না, বরং ভালোবাসেন।

দুনিয়ার ভালোবাসা ভেঙে দেয়, আল্লাহর ভালোবাসা গড়ে তোলে

মানুষের ভালোবাসা অনেক সময় হতাশা ও কষ্টের কারণ হয়। সম্পর্ক ভাঙলে মানুষ ভেঙে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারায়। কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা মানুষকে শক্তিশালী করে। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।- (সূরা আলে ইমরান: ১৪৬) কষ্টের সময় আল্লাহ বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। বরং সেই কষ্টের মধ্য দিয়েই তাকে আরও পরিণত ও শক্ত করে তোলেন। এই ভালোবাসা মানুষকে ধ্বংস নয়, বরং উন্নতির পথে নিয়ে যায়।

মানুষ বিচার করে বাহ্যিকতা দিয়ে, আল্লাহ দেখেন অন্তর

দুনিয়ার মানুষ সাধারণত বাহ্যিক রূপ, সম্পদ বা অবস্থান দেখে ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখেন-তার নিয়ত, তার ইখলাস। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।- (সূরা আলে ইমরান: ৭৬) যে ব্যক্তি নিঃশব্দে ভালো কাজ করে, মানুষের অগোচরে ইবাদত করে- আল্লাহ তার এই আন্তরিকতাকে মূল্য দেন। এটাই আল্লাহর ভালোবাসার সৌন্দর্য।

আল্লাহর ভালোবাসা আসমান-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন আসমানে ঘোষণা দেওয়া হয়- (সহিহ বুখারি: ৭৪৮৫, সহিহ মুসলিম: ২৬৩৭) এটি এমন এক সম্মান, যা দুনিয়ার কোনো ভালোবাসা দিতে পারে না। আল্লাহর ভালোবাসা পেলে মানুষ শুধু পৃথিবীতেই নয়, আসমানেও সম্মানিত হয়।

পরীক্ষা-ভালোবাসার প্রমাণ

দুনিয়ার মানুষ সাধারণত কষ্টে দূরে সরে যায়। কিন্তু আল্লাহ কষ্টের মাধ্যমেই বান্দাকে তাঁর কাছে টেনে নেন। রাসুল (সা.) বলেন, যখন আল্লাহ কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন।” - (তিরমিজি: ২৩৯৬) এই পরীক্ষাই বান্দাকে পরিশুদ্ধ করে, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে।

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ

আল্লাহ ইরশাদ করেন, বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো- (সূরা আলে ইমরান :৩১) অর্থাৎ রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণই আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও নিশ্চিত পথ। পাশাপাশি নফল ইবাদত, দান-সদকা, মানুষের উপকার- এসব কাজও এই ভালোবাসাকে গভীর করে।

শেষকথা: আমরা প্রায়ই দুনিয়ার ভালোবাসার পেছনে ছুটতে গিয়ে হতাশ হই, কষ্ট পাই। অথচ আমাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এমন এক ভালোবাসা, যা কখনো শেষ হবে না, কখনো কমবে না।

আল্লাহর ভালোবাসা এমন এক আশ্রয়, যেখানে ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগে, হতাশ মন আশায় ভরে ওঠে, আর অস্থির জীবন শান্তি খুঁজে পায়। তাই আমাদের উচিত- দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার চেয়ে আল্লাহর চিরস্থায়ী ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেওয়া। কারণ এই ভালোবাসাই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।

লেখক : কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান:জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন