Logo

ধর্ম

​শাওয়ালের রোজা ও কবুলিয়াতের প্রত্যাশা

Icon

​আবদুস সাত্তার সুমন

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৭

​শাওয়ালের রোজা ও কবুলিয়াতের প্রত্যাশা

আজ ২১ শাওয়াল। এ মাসের আর কয়েকদিন বাকি। ​অনেকেই আমরা অবহেলায় কাটিয়ে দিচ্ছি শাওয়াল মাসটি। রমজানের সিয়াম সাধনার পর মুসলিম জীবনে আসে শাওয়াল মাস। এটি ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যারা রমজানে আত্মশুদ্ধির স্বাদ পেয়েছেন, তাদের জন্য শাওয়াল হলো সেই আলোকে ধরে রাখার বাস্তব ক্ষেত্র।

​শাওয়াল মাসের ইবাদত: ধারাবাহিকতার চর্চা

​রমজান আমাদের যে তাকওয়া, সংযম ও ইবাদতের শিক্ষা দেয়, তা যেন শওয়ালে হারিয়ে না যায়। এ মাসে নিয়মিত ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল ইবাদত—তাহাজ্জুদ, দোহা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দান-সদকা অব্যাহত রাখা জরুরি।

​আল্লাহ তাআলা বলেন, ​"তোমরা সৎকর্মে অগ্রসর হও।" (সূরা আল-বাকারা: ১৪৮)

​শাওয়ালের ছয় রোজা: সময়, পদ্ধতি ও ফজিলত

​ঈদের দিন (১ শাওয়াল) রোজা রাখা হারাম। তাই ২ শাওয়াল থেকে শুরু করে মাসের যেকোনো সময় ছয়টি রোজা রাখা যায়—একটানা বা বিরতি দিয়ে উভয়ভাবেই।

​রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ​"যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শওয়ালে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)

​ফিকহি ব্যাখ্যায় বলা হয়, প্রতিটি নেক আমলের জন্য ১০ গুণ সওয়াব নির্ধারিত। সেই হিসেবে 30 \times 10 = 300 এবং 6 \times 10 = 60; মোট ৩৬০ দিন, যা এক বছরের সমান।

​ছয় রোজা ও কবুলিয়াত: শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

​সমাজে প্রচলিত আছে যে, ছয় রোজা রাখলে রমজানের রোজা কবুল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসে সরাসরি এমনটি বলা নেই। ​তবে আলেমদের একটি গভীর ব্যাখ্যা রয়েছে, "একটি নেক আমলের পর আরেকটি নেক আমল করার তাওফিক পাওয়া, পূর্বের আমল কবুল হওয়ার একটি আলামত।"

​আল্লাহ বলেন, ​"নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।" (সূরা আল-মায়েদা: ২৭) ​অতএব, ছয় রোজা কবুলিয়াতের নিশ্চিত প্রমাণ নয়; বরং এটি একটি আশাব্যঞ্জক নিদর্শন।

​আইয়ামে বিজ ও ছয় রোজা: নিয়ত ও ফিকহি দিক

​প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখাকে "আইয়ামে বিজ" বলা হয়। ​রাসূল (সা.) বলেন, ​"প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা যেন সারা বছর রোজা রাখার সমান।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

​এক নিয়তে দুই রোজা হবে কি? এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ​অনেকের মতে এক নিয়তে (ছয় রোজা + আইয়ামে বিজ) রাখলে উভয়ের সওয়াব পাওয়া যেতে পারে। ​অন্যদের মতে প্রতিটি ইবাদতের জন্য পৃথক নিয়ত করা। তবে ​উত্তম হলো আলাদা নিয়তে রাখা; তবে একত্রে রাখলেও ইনশাআল্লাহ সওয়াবের আশা করা যায়।

​কাজা রোজা ও নফল রোজা: অগ্রাধিকার কার

​যাদের রমজানের কিছু রোজা কাজা আছে, তাদের জন্য ফিকহি দৃষ্টিতে ​ফরজ (কাজা) আগে আদায় করা উত্তম। ​এরপর শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা শ্রেয়। ​একসাথে কাজা ও নফলে কিছু আলেম এক নিয়তে করার অনুমতি দিলেও অধিকাংশের মতে—পৃথকভাবে রাখা উত্তম ও অধিক নিরাপদ।

​শাওয়াল মাসে বিয়ে: সুন্নাহ না কুসংস্কার

​সমাজে প্রচলিত আছে যে, শওয়ালে বিয়ে করলে অকল্যাণ হয়। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

​হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ​"রাসূল (সা.) আমাকে শাওয়াল মাসে বিয়ে করেছেন এবং শওয়ালেই আমার সাথে সংসার শুরু করেছেন।" (সহিহ মুসলিম: ১৪২৩) ​এটি প্রমাণ করে যে শওয়ালে বিয়ে করা সুন্নাহসম্মত ও বরকতময়।

​শাওয়ালের শিক্ষা: ধারাবাহিক আমলই সফলতা

​রাসূল (সা.) বলেন, ​"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

​শাওয়াল মাস কেবল আনন্দের নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ধারাবাহিক ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক সুবর্ণ সুযোগ। রমজানের আলো যেন শাওয়ালের মাধ্যমে আমাদের জীবনে স্থায়ী হয়ে ওঠে—এই হোক আমাদের প্রার্থনা।

লেখক: প্রাবন্ধিক

​মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন