Logo

ধর্ম

​ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা বনাম চিরস্থায়ী সাফল্য

Icon

​ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০১

​ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা বনাম চিরস্থায়ী সাফল্য

​মানবজীবনের এক অনিবার্য সত্য হলো—ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও দুনিয়ার জৌলুস কখনো স্থায়ী নয়। আজ যার প্রভাব-প্রতিপত্তি সর্বোচ্চ, কাল সেই হতে পারে বিস্মৃত অতীত। কিন্তু নেক আমল, সৎকর্ম ও আল্লাহভীতি এমন এক সম্পদ, যা কখনো হারায় না; বরং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সম্মান ও সফলতা বয়ে আনে।

​ক্ষমতার অস্থায়িত্ব: কোরআনের শিক্ষা

​পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আজাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।" (সূরা আল-হাদীদ: ২০)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—দুনিয়ার সবকিছুই সাময়িক। মানুষ যে ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করে, তা একদিন বিলীন হয়ে যায়।

​আরও বলা হয়েছে— "বলো, হে আল্লাহ! তুমি সমুদয় রাজ্যের মালিক, যাকে ইচ্ছে রাজ্য দান করো আর যার থেকে ইচ্ছে রাজ্য কেড়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছে সম্মানিত করো আর যাকে ইচ্ছে অপদস্থ করো, তোমারই হাতে সব রকম কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।" (সূরা আলে ইমরান: ২৬)। অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষের নিজস্ব নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি পরীক্ষা।

​নেক আমলের চিরস্থায়ী মর্যাদা

​আল্লাহপাক বলেন, "ধন-সম্পদ আর সন্তানাদি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য, আর তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার লাভের জন্য স্থায়ী সৎকাজ হলো উৎকৃষ্ট আর আকাঙ্ক্ষা পোষণের ভিত্তি হিসেবেও উত্তম।" (সূরা আল-কাহফ: ৪৬)। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—দুনিয়ার বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে নেক আমলই প্রকৃত সফলতা।

​আরও বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।" (সূরা যিলযাল: ৭)। এতে বোঝা যায়—ছোট্ট একটি ভালো কাজও আল্লাহর কাছে অমূল্য।

​হাদিসের আলোকে দুনিয়া ও আখিরাত

​দুনিয়ার প্রকৃতি: আবু হুরাইরাহ (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাততুল্য। (সহিহ মুসলিম: ২৯৫৬)। এটি বোঝায়—মুমিন ব্যক্তি দুনিয়াকে চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে না; বরং আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।

​মৃত্যুর পরও যে আমল অব্যাহত থাকে

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া।

১. সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা

২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা

৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দুআ করতে থাকে। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)।

নেক আমলের এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—সৎকর্ম কখনো শেষ হয় না।

​মানুষের জন্য উপকারী হওয়া

​রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: মানুষের মধ্যে সেই উত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (মুসনাদ আহমাদ: ২৩৪০৫)। এখানে বোঝানো হয়েছে—মানবসেবা নিজেই একটি বড় নেক আমল।

​আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য নিবেদিত এমন অনেক বান্দা আছে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকার করার জন্য বিশেষ নিয়ামত দান করেন। যতক্ষণ তারা সেগুলো মানবকল্যাণে ব্যয় করে ততক্ষণ তিনি তাদের সেসব নিয়ামতের মধ্যে বিদ্যমান রাখেন। কিন্তু যখন তারা সেই উপকার করা বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি তাদের থেকে নিয়ামত ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের দিয়ে দেন। (সহিহুত তারগিব, হাদিস: ২৬১৭)

​আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে যাবে না। যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনে তার কষ্টগুলো থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। (বুখারি, হাদিস: ২৪৪২)

​অহংকারের পরিণতি

​আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, মানুষ চায় যে তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এ-ও কি অহংকার? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা। (সহিহ মুসলিম: ৯১)। অহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

​নিয়তের গুরুত্ব

​রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে—তবে তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্যে সে হিজরত করেছে। (সহিহ বুখারি: ১)। সুতরাং নেক আমলের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ নিয়ত।

​ক্ষমতার অহংকার: ধ্বংসের কারণ

​কোরআনে কারুনের ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, "নিশ্চয় কারুন ছিল মূসার কওমভুক্ত। অতঃপর সে তাদের ওপর ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অথচ আমি তাকে এমন ধনভাণ্ডার দান করেছিলাম যে, নিশ্চয় তার চাবিগুলো একদল শক্তিশালী লোকের ওপর ভারী হয়ে যেত। স্মরণ করো, যখন তার কওম তাকে বলল, ‘দম্ভ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালোবাসেন না’।" (সূরা আল-কাসাস: ৭৬)। কারুন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়। এটি আমাদের শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা ও সম্পদ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

​নেক আমল: প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি

​আল্লাহ বলেন: "যে সৎকাজ করবে নিজের কল্যাণেই করবে। যে অসৎ কাজ করবে তার পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে। তোমার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি জালিম নন।" (সূরা ফুসসিলাত: ৪৬)। নেক আমলের মধ্যে রয়েছে—ইবাদত, দান-সদকা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা।

​দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য

​আল্লাহ বলেন, "আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো। আর জমিনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালোবাসেন না।" (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)। অর্থাৎ দুনিয়াকে ত্যাগ নয়, বরং আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

​পরিশেষে বলতে চাই, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী—আজ আছে, কাল নেই। কিন্তু নেক আমল চিরস্থায়ী—এটি দুনিয়ায় সম্মান ও আখিরাতে মুক্তির পথ তৈরি করে। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে নেক আমলের মাধ্যমে চিরস্থায়ী সফলতা অর্জনের চেষ্টা করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নেক আমলের তাওফিক দান করুন এবং অহংকার থেকে হেফাজত করুন।

​লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার

ইমেইল: drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন