Logo

ধর্ম

​জালেমের সহযোগিতা ও সমর্থনও অন্যায়

Icon

​মাওলানা বুরহানুদ্দীন বিন সা'দ

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৪

​জালেমের সহযোগিতা ও সমর্থনও অন্যায়

​কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা করারও ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও মানদণ্ড রয়েছে। যে কেউ কোনো কাজের সমর্থন চাইলেই বা যে কারো কোনো কাজ নিজের মনমতো হলেই নির্দ্বিধায় তার সাথে সহমত পোষণ ও সহযোগিতা করা যায় না। কারণ, কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্য হলো, সমর্থনকারীর ওপরেও কাজের দায় বর্তাবে। সহযোগিতাকারীও সওয়াব ও গুনাহের ভাগিদার হবে। কাজেই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য অন্যের কেবল কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত কাজেই শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় সহযোগিতা করা। যেন অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে গিয়ে শরীয়ত লঙ্ঘন করা না হয়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ​"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরে সহযোগিতা করো। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।" —(সূরা মায়েদা: ০২)

​উক্ত আয়াতের শিক্ষা এই যে, কোনো বিষয়ে অন্যকে সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য শর্ত হলো—যে বিষয়ে আমি সহযোগিতা করছি, তা নেক কাজ ও তাকওয়ার বিষয় হতে হবে। জালেমের পক্ষাবলম্বন করা ও সমর্থন করা বড় অন্যায় ও গুনাহের কাজ। শরীয়তের নির্দেশনা হলো, জালেমকে যথাসম্ভব জুলুম থেকে বাধা দেওয়া; কমপক্ষে অন্তর থেকে ঘৃণা করা। এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ​"তোমরা জালেমদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকেও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো রকমের বন্ধু লাভ হবে না। আর তখন কেউ তোমাদের সাহায্য করবে না।" —(সূরা হূদ: ১১৩)

​এ আয়াতের মধ্যে সেসব লোকের জন্য বড় শিক্ষার উপকরণ রয়েছে, যারা জালেমদেরকে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অন্যায় সমর্থন দিয়েছেন। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির ধমকি দিয়েছেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় সালাফে সালেহীন জালেমের সমর্থনের বেশ কিছু দিক বলেছেন:

​১. জালেমের সঙ্গে সখ্য ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা। এমনিতেই ইসলামের মুআলাত ও বন্ধুত্বের মানদণ্ড হলো ঈমান ও তাওহীদ। ঈমান ও তাওহীদকে বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কোনো দর্শন ও মতাবাদকেন্দ্রিক ঐক্য ও বন্ধুত্ব গড়ার কোনো সুযোগ নেই।

​২. জালেমের জুলুম ও অন্যায়-অবিচারকে পছন্দ করা ও তার প্রতি অন্যায় পক্ষপাত লালন করা।

​৩. প্রতিবাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জালেমের জুলুমের প্রতিবাদ না করা; বরং এর ওপর মৌনতা অবলম্বন করা।

​৪. জালেমের সংশ্রব গ্রহণ করা ও তার ব্যাপারে নমনীয়তা অবলম্বন করা।

​৫. বাহ্যিক বেশভূষায় ও জীবনাচারে জালেমের অনুসরণ করা; তাকে অনুকরণীয় হিসেবে গ্রহণ করা।

​এ আয়াতে জালেমের সঙ্গে শুধু সখ্য ও সম্পর্ককেই নিষেধ করা হয়নি; বরং জালেমের ব্যাপারে সামান্যতম শিথিলতাকেও নিষেধ করা হয়েছে। (দ্র. তাফসীরে তবারী ৭/১২৩-১২৪; তাফসীরে কুরতুবী ৯/৭২; তাফসীরে মাযহারী ৪/৪৩০; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ৪/৬৭২-৬৭৩)

​মোদ্দাকথা হলো, যারা জালেমকে জুলুমের কাজে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন করেছে তাদের উচিত, নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে খাঁটি দিলে তওবা করা, মাজলুমের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং হক ফিরিয়ে দেওয়া। অন্যথায় তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে দুনিয়া ও আখেরাতের লাঞ্ছনাকর শাস্তি।

​জালেমের শাস্তি

​কারোর জন্য অন্যের ওপর যেকোনোভাবে জুলুম, অত্যাচার অথবা অন্যায়মূলক আক্রমণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। কাউকে মারা, হত্যা করা, আহত করা, গালি দেওয়া, অভিসম্পাত করা, ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া, দুর্বলের ওপর হাত উঠানো—চাই সে হোক নিজের কাজের ছেলে কিংবা নিজের কাজের মেয়ে অথবা নিজ স্ত্রী-সন্তান; তেমনিভাবে জোর করে কারো কোনো অধিকার হরণ ইত্যাদি জুলুমেরই অন্তর্গত।

​জুলুম পারস্পরিক বন্ধুত্ব বিনষ্ট করে, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করে। মানুষের মাঝে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় এবং এরই কারণে ধনী ও গরিবের মাঝে ধীরে ধীরে ঘৃণা ও শত্রুতা জেগে ওঠে। তখন উভয় পক্ষই দুনিয়ার বুকে অশান্তি নিয়েই জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়।

​আল্লাহ তাআলা জালিমদের জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন, যা তাকে গ্রহণ করতেই হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ​"আমি জালিমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানি, যা তাদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেবে। এটা কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং সে জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়!" —(সূরা কাহফ: ২৯)

​আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ​"অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোথায় তাদের গন্তব্যস্থল!" —(সূরা শুয়ারা: ২২৭)

​আবু যর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— আল্লাহ তাআলা বলেন, ​"হে আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই আমি আমার ওপর জুলুম হারাম করে দিয়েছি, অতএব তোমাদের ওপরও তা হারাম। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না।" —(সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭)

​কেউ কেউ কোনো জালিমকে অনায়াসে মানুষের ওপর জুলুম করতে দেখলে এ কথা ভাবে যে, হয়তো বা সে ছাড় পেয়ে গেল; তাকে আর কোনো শাস্তিই দেওয়া হবে না। না, ব্যাপারটা কখনোই এমন হতে পারে না। বরং আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

​লেখক: উস্তাযুল হাদীস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান, চাঁদপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন