Logo

ধর্ম

​দাওয়াত ও তাবলিগ ঈমানের সৌরভ

Icon

​মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫০

​দাওয়াত ও তাবলিগ ঈমানের সৌরভ

মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন, সত্য-অসত্যের পার্থক্য বুঝিয়েছেন এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। ইসলামে এ দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দাওয়াত হলো মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা এবং তাবলিগ হলো সেই আহ্বানকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। এ দাওয়াত ও তাবলিগ ঈমানের সৌরভের মতো, যা হৃদয়কে পবিত্র করে, সমাজকে কল্যাণমুখী করে এবং আখিরাতকে সফলতার পথে নিয়ে যায়।

​কুরআনের আলোকে দাওয়াত ও তাবলিগ

​আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে বহু জায়গায় দাওয়াতের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন— ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই যারা মানুষের কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকর্মের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখবে। তারাই সফলকাম।’ [সুরা আলে ইমরান: ১০৪]। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিচ্ছে, মুসলিম উম্মাহর জন্য দাওয়াত একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। শুধু নিজে আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং সমাজকেও কল্যাণের পথে ডেকে নেওয়া আবশ্যক।

​আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন— ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমতের মাধ্যমে এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। তাদের সাথে তর্ক করো উত্তমভাবে।’ [সুরা নাহল: ১২৫]। এখানে দাওয়াতের আদব ও পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। জোর-জবরদস্তি নয়; বরং প্রজ্ঞা, নরম ভাষা ও সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের পথে ডাকা।

​হাদিসের আলোকে দাওয়াত ও তাবলিগ

​রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের সর্বোত্তম নমুনা। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ দাওয়াতের আলোয় উদ্ভাসিত। তিনি বলেছেন— ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ মন্দ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে। যদি তা না পারে, তবে মুখে নিন্দা করুক। আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করুক, আর এটি হলো ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।’ [সহিহ মুসলিম]।

​অন্য হাদিসে এসেছে— ‘আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও একটি আয়াত হয়।’ [সহিহ বুখারি]। এ থেকে বোঝা যায়, দাওয়াত দেওয়া কেবল আলেম-উলামাদের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। যার কাছে যতটুকু জ্ঞান আছে, সে ততটুকুই অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে।

​দাওয়াত ও তাবলিগের প্রয়োজনীয়তা

​১. ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধি: দাওয়াত মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখে এবং নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করে। যখন কেউ অন্যকে ইসলামের পথে আহ্বান করে, তখন নিজের ভেতরেও ঈমানের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে।

২. সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা: তাবলিগ ছাড়া সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। দাওয়াত মানুষকে অন্যায়, জুলুম ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে এবং সৎপথে পরিচালিত করে।

৩. মানবতার কল্যাণ: ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, এটি মানবতার জন্য দিশারি। দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে এবং মানবতার প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত হয়।

৪. আখিরাতের সাফল্য: যারা দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত হয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্যাদা দান করেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন— ‘তার চেয়ে উত্তম কথা কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ [সুরা ফুসসিলাত: ৩৩]।

​দাওয়াত ও তাবলিগের আদব ও করণীয়

​প্রজ্ঞা ও হিকমত: দাওয়াতকারীর উচিত মানুষের মানসিকতা, জ্ঞান ও পরিবেশ অনুযায়ী কথা বলা। কঠোরতা বা হীনমন্যতা নয়; বরং নম্রতা ও প্রজ্ঞা থাকা জরুরি।

​সুন্দর চরিত্র: দাওয়াত তখনই প্রভাব ফেলবে যখন দাওয়াতকারীর জীবন ইসলামের সৌন্দর্যে ভরা থাকবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র ছিল কুরআনের জীবন্ত প্রতিফলন।

​ধৈর্য ও সহনশীলতা: দাওয়াতের পথে কষ্ট, অপমান ও বাধা আসবে। আল্লাহ বলেন— ‘তুমি ধৈর্য ধারণ করো, যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় সংকল্পবান রাসুলগণ।’ [সুরা আহকাফ: ৩৫]।

​অহংকার থেকে দূরে থাকা: দাওয়াত কোনো প্রাধান্য বিস্তারের মাধ্যম নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর দীনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিনয়ী প্রচেষ্টা।

​তাবলিগ জামাত ও বর্তমান যুগে দাওয়াত

​আধুনিক যুগে দাওয়াতের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। চারদিকে নাস্তিকতা, বস্তুবাদিতা ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় দাওয়াত হলো ঈমানের সৌরভ ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম উপায়। বিশ্বব্যাপী তাবলিগ জামাত, ইসলামি দাওয়াতি সংস্থা ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজে নিয়োজিত।

​তাবলিগ জামাতের মূলনীতি— ‘ঈমান ও আমলকে জীবনে জাগ্রত করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, ইসলামের মৌলিক শিক্ষার দিকে মানুষকে ডেকে আনা।’ এটি আসলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতি চর্চারই ধারাবাহিকতা।

​দাওয়াত ও তাবলিগে অবহেলার ক্ষতি

​যদি মুসলিমরা দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব ভুলে যায়, তবে সমাজে অশান্তি, অন্যায় ও নৈতিক অধঃপতন ছড়িয়ে পড়ে। হাদিসে এসেছে— ‘তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে, অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন, তারপর তোমরা দোয়া করলে তা কবুল করা হবে না।’ [তিরমিজি]। এ থেকে স্পষ্ট হয়, দাওয়াত অবহেলা করলে আল্লাহর গজব নেমে আসে।

​ঈমানি দায়িত্ব

​দাওয়াত ও তাবলিগ হলো ইসলামের প্রাণস্পন্দন। এটি কেবল কিছু আলেম বা বিশেষ দলের কাজ নয়; বরং প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। যেমন ফুলের সৌরভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমে ঈমানের সুগন্ধ মানবসমাজে ছড়িয়ে যায়। কুরআন-হাদিস আমাদের শিখিয়েছে, দাওয়াতই হলো সফল উম্মাহর মূল বৈশিষ্ট্য। তাই আসুন, আমরা সবাই দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে নিয়োজিত হই, ঈমানের সৌরভে নিজেদের ও সমাজকে ভরে তুলি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করি।

​লেখক: মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন