কওমি মাদরাসায় ভর্তি প্রক্রিয়া
সংকট, বাস্তবতা ও করণীয়
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৫৪
বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো যুগ যুগান্তরের দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রতি বছর বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়ার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মেধাবী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে ভালো মাদরাসায় ভর্তির আগ্রহ দেখা যায়। বিশেষ করে ঢাকা ও এর বাইরে কয়েকটি স্বনামধন্য মাদরাসায় ভর্তির জন্য অভিভাবকদের সরাসরি উপস্থিত হতে হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ- সরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষিত পরিবার- তাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভর্তির এই প্রক্রিয়া এখনও আধুনিক ও শিক্ষাবান্ধব হয়ে ওঠেনি।
অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে দেশের অল্প কিছু মাদরাসায় অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু থাকলেও প্রায় ৯০% মাদরাসায় এটি অনুপস্থিত। যেখানে অনলাইন আবেদন রয়েছে, সেখানেও নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ শোনা যায়। অনলাইনে আবেদন করার পর আবার আলাদাভাবে ফি জমা দেওয়ার ঝামেলা, ভর্তি পরীক্ষার সময় অসংগঠিত পরিবেশ, এবং নিম্নমানের সফটওয়্যারের কারণে তথ্য বিভ্রাট- এসব সমস্যা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিভাবকদের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ
অধিকাংশ মাদরাসায় অভিভাবকদের জন্য ন্যূনতম বসার জায়গা বা পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। অথচ ইসলাম মেহমানদারিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন অভিভাবক যখন তার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য মাদরাসায় আসেন, তখন তার প্রতি সম্মান ও যত্ন প্রদর্শন করা প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক দায়িত্ব।
ভর্তি প্রক্রিয়ার অসংগতি
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনলাইনে আবেদন করার পরও পুনরায় হাতে ফর্ম জমা দিতে হয় এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে হয়। আবার কোথাও “ভর্তিযুদ্ধ” নামে প্রতিযোগিতামূলক একটি চিত্র তুলে ধরা হয়, যা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীর একটি ছোট অংশই দ্বীনি শিক্ষায় যুক্ত-এই বাস্তবতায় তাদের জন্য সহজ ও সম্মানজনক ভর্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।
করণীয় ও প্রস্তাবনা
১. স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল ভর্তি ব্যবস্থা: ফলাফলের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যেখানে টোকেন বা ইউনিক আইডির মাধ্যমে ভর্তি নিশ্চিত করা হবে। এতে সময় ও ভোগান্তি কমবে।
২. অনলাইন পেমেন্ট ও স্বচ্ছতা: ভর্তি ফি অনলাইনে গ্রহণ এবং ফলাফল দ্রুত অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
৩. অভিভাবকদের জন্য মানবিক ব্যবস্থা: ভর্তির দিন আলাদা ওয়েটিং এরিয়া, বিশুদ্ধ পানিয় জল ও বসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি সাইনবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগের তথ্য স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা জরুরি।
৪. সময় ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন: ডিজিটাল কিউ সিস্টেম চালু করে লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্টের সংস্কৃতি দূর করা যেতে পারে।
৫. শিক্ষক-কর্মচারীদের আচরণ: মাদরাসা শুধু জ্ঞানার্জনের স্থান নয়, এটি আদর্শ গঠনের ক্ষেত্রও। তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।
৬. যৌক্তিক ফি কাঠামো: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে ভর্তি ফি নেওয়া হলেও শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম। এই বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা
কোনো কোনো মাদরাসায় সারা বছর ভর্তি চললেও, আবার কোথাও খুব স্বল্প সময়ের জন্য ভর্তি কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে। এটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বিভ্রান্তিকর। তাই একটি যৌক্তিক সময়সীমা নির্ধারণ এবং বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়ার পক্ষ থেকে সমন্বিত ভর্তি নীতিমালা প্রণয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদিও সব প্রতিষ্ঠান তা অনুসরণ করবে- এমন নিশ্চয়তা নেই, তবুও একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
আমি দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে মাদরাসা শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভালো কাজের প্রশংসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ত্রুটির সমালোচনাও জরুরি। ইসলামে ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলো যদি সত্যিকার অর্থে এই আদর্শ ধারণ করতে চায়, তবে ভর্তি প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও মানবিক করতে হবে।
কওমি মাদরাসা কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক “রাজ্য” নয়; এটি একটি আমানত- উম্মাহর ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সংশ্লিষ্ট মুহতামিম ও দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান- আরও মানবিক, শিক্ষাবান্ধব ও সময়োপযোগী হওয়ার।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক
পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

