Logo

ধর্ম

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৮

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

ইতিহাস কেবল ঘটনাপুঞ্জ নয়; বরং তা জাতির আত্মা, স্মৃতি আর চেতনার সঞ্চয়। ১৮৫৭ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ভারতীয় উপমহাদেশ যেন এক রক্তাক্ত দিগন্ত। আকাশে ঝুলছিল পরাজয়ের কালো ছায়া, বাতাসে ভাসছিল পরাধীনতার গন্ধ, আর মুসলিম সমাজ ছিল ভগ্নস্বপ্নের এক জনপদ। সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছিল যে প্রতিষ্ঠান, তার নাম দারুল উলুম দেওবন্দ। একটি কুঁড়েঘরে জন্ম নেওয়া এই আলোকবর্তিকা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে ইসলামি জ্ঞানের মহাবিশ্ব, আধ্যাত্মিকতার শিরোমণি এবং স্বাধীন চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক।

১৮৫৭ : এক ভাঙনের ইতিহাস

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব ছিল মুসলমানদের হৃদয়ের সর্বশেষ ধুকপুকানি। দিল্লির আকাশে যখন স্বাধীনতার পতাকা উড়েছিল, তখন মুসলিম সেনারা রক্ত দিয়ে সেই পতাকার লাল রঙ লিখেছিল। কিন্তু পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঙ মুছে যায়; ব্রিটিশরা শূন্য করে দেয় দিল্লির অলি-গলি, লুট করে নেয় মুসলিম সম্ভ্রান্তদের ঘরবাড়ি, ধ্বংস করে দেয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির আসর।

মুঘল সিংহাসনের শেষ আলো নিভে যায়, আর মুসলমানরা হয়ে পড়ে পরাধীনতার বোঝা বহনকারী জাতি। এ যেন এক ঝড়ে উড়ে যাওয়া বনভূমিÑগাছ নেই, ছায়া নেই, কেবল পোড়া মাটির হাহাকার।

বিপর্যয়ের ছায়ায় মুসলমান

বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর ব্রিটিশরা মুসলমানদের প্রতি এমন প্রতিশোধপরায়ণ হয়েছিল যে, তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি চাকরি থেকে মুসলমানদের বহিষ্কার করা হলো। জমিদারি কেড়ে নেওয়া হলো। কোর্ট-কাচারিতে ফারসি ভাষা বাতিল করে দেওয়া হলো, মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ভরসাটুকুও কেড়ে নেওয়া হলো। মুসলিম সমাজ তখন দিশেহারা। কেউ আধুনিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছিল, কেউ আবার পরম্পরাগত আধ্যাত্মিকতায় আশ্রয় খুঁজছিল।

আলেমসমাজের অন্তর্দৃষ্টি

যখন জনপদে চারিদিকে হতাশার ধোঁয়া, তখন একদল আলেম বুঝতে পারলেন- মুসলমানদের রক্ষা করতে হলে ইসলামি শিক্ষার পতাকা উঁচুতে তুলে ধরতেই হবে। কারণ শিক্ষা হলো আত্মার খাদ্য, জাতির প্রাণশক্তি।

মাওলানা কাসেম নানুতবি [প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ও মূল ব্যক্তি], মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি [প্রথম প্রধান শিক্ষক], মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি [আধ্যাত্মিক ও ফিকহী দিকনির্দেশক], মাওলানা জুলফিকার আলি [প্রথম মুহতামিম], হাফেজ আবিদ হোসাইন [প্রথম শিক্ষক], হাজি আবিদ হুসাইন [অর্থদাতা ও সহায়তাকারী] প্রমুখ দিগন্তদ্রষ্টা আলেমরা একত্র হলেন। তারা ভাবলেনÑ সোনার প্রাসাদ নয়, দরকার এমন এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে কোরআন-হাদিসের আলোয় প্রজন্ম জেগে উঠবে, যেখানে ঈমানের শিখা নিভে যেতে দেবে না কেউ।

দেওবন্দ : এক কুঁড়েঘরে সূচনা

১৮৬৬ সালের ৩০ মে, সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক ছোট্ট জনপদে একটি কুঁড়েঘরের ছায়ায় শুরু হলো নতুন ইতিহাস। সেই ছাপড়া ঘরটাই ছিল নবজাগরণের আঁতুড়ঘর। প্রথম শিক্ষক ছিলেন মাওলানা মাহমুদ হাসান, যিনি পরে ‘শায়খুল হিন্দ’ নামে খ্যাত হন।

ছাত্র ছিল মাত্র একজন। কিন্তু তার বুকভরা স্বপ্ন ছিল হাজার তরুণের সমান। অর্থায়ন ছিল সাধারণ মুসলমানদের দান-খয়রাত; কেউ গরুর দুধ দিল, কেউ চাল দিল, কেউ দিল সামান্য পয়সা। এ যেন এক বীজ মাটিতে ফেলা হলো, পানি দিল অশ্রু, সার দিল আত্মত্যাগ; আর কয়েক দশকের মধ্যে তা পরিণত হলো বিশাল এক বটবৃক্ষে।

দেওবন্দের শিক্ষা পদ্ধতি

দেওবন্দ কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করবার স্থান ছিল না; বরং তা ছিল হৃদয়ের জাগরণের মাদরাসা। দরসে নিজামী পাঠ্যক্রমকে নতুনভাবে সাজানো হলো। কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি সাহিত্য, যুক্তি ও দর্শন শেখানো হতো। শিক্ষকরা কেবল বিদ্যার আলো দিতেন না; দিতেন ঈমান, দিতেন সাহস, দিতেন আত্মত্যাগের শিক্ষা। একজন দেওবন্দী ছাত্র যেন জ্ঞানের আলো হাতে নিয়ে সমাজে যেতেন অন্ধকার ভাঙতে।

দেওবন্দ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য ছিল স্বকীয় ও অনন্য-

এক. আধ্যাত্মিকতার শুদ্ধ ধারা : এখানে সুফিবাদের সাথে শিরক-মিশ্রণ নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক খাঁটি তাসাউফ শেখানো হতো।

দুই. রাজনৈতিক চেতনা : শিক্ষার্থীদের মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগানো হতো। রেশমি রুমাল আন্দোলন তারই এক দৃষ্টান্ত।

তিন. জনআর্থিক ভিত্তি : প্রাসাদোপম দান নয়, সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে গড়া টাকা দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি চলত। এতে জনগণের সাথে ছিল গভীর সংযোগ।

চার. উর্দু ভাষার প্রচার : উর্দু কেবল ভাষা নয়, ছিল মুসলিম সংস্কৃতির পরিচয়। দেওবন্দ এটিকে শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করে।

পাঁচ. ত্যাগ ও সাধনা : শিক্ষকরা কোনো বেতন নিতেন না, ছাত্ররা থাকতেন সাদামাটা জীবনে। এ ছিল প্রকৃত ইখলাসের মূর্তি।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

দেওবন্দ একদিনে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়নি, কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যে এটি হয়ে ওঠে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনন্য দিশারী। ভারতে গ্রাম-গঞ্জে অসংখ্য মকতব-মাদরাসা গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা আন্দোলনে দেওবন্দী আলেমরা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, কিন্তু পতাকা নামাননি। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, আফ্রিকা; সর্বত্র দেওবন্দের আদর্শে মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যেন দেওবন্দ এক প্রদীপ, যেখান থেকে শত শত প্রদীপ জ্বলে উঠেছে, আলোকিত করেছে দুনিয়ার কোণে কোণে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশেও দেওবন্দের আদর্শ অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রামের দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, ঢাকার জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ফেনীর জামিয়া রশীদিয়া, বগুড়ার জামেয়া কারবালা, সিলেটের জামিয়া দরগাহ, হবিগঞ্জের জামিয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া-সহ অসংখ্য কওমি মাদরাসা। এসব প্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষা নয়; বরং জাতীয় চেতনা, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক সংস্কারে অসামান্য অবদান রেখেছে।

আলোর মিনার

দারুল উলুম দেওবন্দ এক কথায় মুসলমানদের ভগ্নহৃদয়ের পুনর্গঠন। এটি হলো আশার প্রদীপ, যা পরাধীনতার অন্ধকারে জ্বলেছিল। যদি দেওবন্দ না হতো, তবে হয়তো মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় নিঃশেষ হয়ে যেত। দেওবন্দ হলো ত্যাগের বিশ্ববিদ্যালয়, সাহসের দুর্গ, আলোর মিনার।

চেতনার প্রতীক

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে- ১৮৫৭-পরবর্তী অন্ধকার থেকে মুসলমানদের বের করে আনতে দারুল উলুম দেওবন্দ এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। একটি কুঁড়েঘরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ কোটি মানুষের হৃদয়ের দিশারী। দারুল উলুম দেওবন্দ কেবল একটি নাম নয়; বরং তা হলো সংগ্রামের প্রতীক, আত্মত্যাগের প্রতীক, ইসলামের খাঁটি চেতনার প্রতীক। যতদিন মুসলিম উম্মাহ টিকে থাকবে, ততদিন দেওবন্দের নাম ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন