ব্রিটিশ পর্ব
১৮৫৭ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহী-জনতা বিপ্লবের পর আলেমদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। জেল-জুলুম, হুলিয়া জারি হয় সংগ্রামী আলেমদের বিরুদ্ধে। বিধ্বস্ত এই পরিবেশে কেউ কেউ হিজরত করেন মক্কায়। ব্রিটিশরা অনেক সংগ্রামী আলেমকে ফাঁসি দেয়। আলেমদের বিরুদ্ধে অভিযান চলে। তখন তারা নতুন পন্থা অবলম্বন করেন শিক্ষা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন। নতুন সৈনিক তৈরিতে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল উলূম দেওবন্দ।
১৮৬৬ সালে আল্লামা কাসেম নানুতবী (রহ.) ও তাঁর সহযোদ্ধারা দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদরাসার প্রথম ছাত্র আল্লামা মাহমুদ হাসান (শায়খুল হিন্দ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আন্দামানে নির্বাসিত হন। তিনি ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী আলেম। তাঁর জীবনী জানতে পড়তে পারেন ‘আসীরানে মাল্টা’ (উর্দু) বইটি।
১৮৬৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দারুল উলূম দেওবন্দ ‘ব্রিটিশ হটাও’ আন্দোলনের সৈনিক তৈরি করেছে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ চলে যেতে বাধ্য হয়। উপমহাদেশ বিভক্ত হয়, স্বাধীন হয় ভারত।
ব্রিটিশ আমলে কওমি মাদরাসা ছিল সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত। সিলেবাস ছিল নিজস্ব। এই সময়ে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসা মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী (হাটহাজারী মাদরাসা) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০১ সালে। এই মাদরাসাও ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণমুক্ত ছিল। উপমহাদেশের সব কওমি মাদরাসা দেওবন্দ ও হাটহাজারী মাদরাসার মতো স্বাধীন ও স্বকীয় ছিল। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
পাকিস্তান পর্ব
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে মুক্তি পায়। দেশ বিভক্ত হয় হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান। পাকিস্তান ইসলামের নামে গঠিত হলেও ইসলামের তেমন লাভ হয়নি। স্বৈরাচার আইয়ুব খানরা ইসলামি আইন বিকৃত করে। পূর্ব পাকিস্তানে জুলুম চালায়। ইসলামের সঙ্গে গদ্দারি করে।
পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) কওমি মাদরাসা ছিল স্বাধীন সিলেবাসে ও সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৫০০টি, শিক্ষক ২৬০৮ জন, ছাত্র ৫৬,৫৭৭ জন (সূত্র: ইসলামি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ)। পাকিস্তানের শাসকরা কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তারা স্বাধীনভাবে দীনি খেদমত অঞ্জাম দিয়েছে।
বাংলাদেশ পর্ব
১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। রক্তসাগর পেরিয়ে আসা এই স্বাধীনতা, লাল-সবুজের পতাকা, নতুন স্বপ্ন শহীদের রক্তে রঞ্জিত।
১৯৭১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কওমি মাদরাসা সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত, স্বাধীন সিলেবাসে চলে। আলেমদের সংগ্রামী ভূমিকা ১৭৫৭ সাল থেকেই দেশ ও মাটির প্রতি। দেশপ্রেম তো আলেমদের শেখাতে হয় না। এই দেশকে ব্রিটিশমুক্ত করতে হাজার হাজার আলেম শহীদ হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চেও স্বাধীনতার কথা বলেছেন, দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। ব্রিটিশের বদনজর থেকে মাদরাসাকে রক্ষায় সংগ্রাম করে সফল হয়েছেন।
২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল থেকে কওমি মাদরাসা বাংলাদেশে নতুন যুগে পা দেয়- সরকারি স্বীকৃতি ও সনদ লাভ করে। ব্রিটিশ যুগের আগেও ছিল মাদরাসা, ব্রিটিশ যুগেও ছিল, আজও আছে, সামনেও থাকবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কওমি মাদরাসা কি সরকারি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে?
সিলেবাসের আধুনিকায়নের নামে মূলধারার শিক্ষার কথা বললে কি সংকটের কবলে পড়বে?
হারাবে কি তার ঐতিহ্য?
সরকারি মাদরাসার পরিণাম তো অতীতে ভালো হয়নি।
মাদরাসা দেশ মানবে, দেশের স্বাধীনতা ও আইন মানবে। কিন্তু সব মানলেও কি কওমি মাদরাসা তাদের ঐতিহ্য ধ্বংস হতে দেবে?
সময় কথা বলবে। আমরা দুআ করি, সরকার যেন ঐতিহ্য রক্ষা করে। কওমির কাণ্ডারিরা যেন অতীতের কথা মনে রাখেন এবং মিডিয়ার আগ্রাসনের যৌক্তিক জবাব দিতে সক্ষম হন।
কী হবে এখন? কওমি মাদরাসা কি ঐতিহ্য হারাবে?
আমি বিশ্বাস করি, কওমি মাদরাসা পথ হারাবে না। দেশপ্রেমের বীজ কওমি মাদরাসায়- পল্লবিত, পুষ্পিত। স্বাধীনতা রক্ষায় কওমি মাদরাসা একটি দুর্গ। ঈমান ও আযাদীর দুর্গ। দেশের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা কওমি ঐতিহ্যের প্রতি খেয়াল রেখে মতামত দেবেন- এই প্রত্যাশা।
সাড়ে চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে দ্বীনি শিক্ষা ছিল স্বাধীন ও স্বকীয়। দ্বীনি শিক্ষা আমাদের জীবনকে সুখময় করে। দ্বীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তা জানতে ব্রিটিশ, তুরস্কের কামাল এবং মধ্যএশিয়ার কমিউনিস্টদের যুগে বোখারা, সমরকন্দ, তাশকন্দের মাদরাসাগুলোর ইতিহাস পড়তে হবে। হারানো ঐতিহ্যের দেশে দেশে যেতে হবে।
কওমি মাদরাসায় লাল-সবুজের পতাকা উড়বে। ১৯৪৭ সালে আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী ও আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। লাল-সবুজের পতাকা আমাদের আবেগের। শহীদের রক্ত কথা বলে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক
পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

