Logo

ধর্ম

আল-হালিকা: দ্বীনকে ধ্বংসকারী রোগ

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩০

আল-হালিকা: দ্বীনকে ধ্বংসকারী রোগ

ভোরের আকাশ। ফজরের নামাজের পর আমি বসেছিলাম। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো ফুটে উঠছে, আর পশ্চিমাকাশ তখনও মেঘের চাদরে ঢাকা, নিভু নিভু অন্ধকার। মৃদু বাতাসে গাছের পাতা দুলছে, দূর থেকে ভেসে আসছে মেঘের গর্জন- বৃষ্টিস্নাত সকালের এক অপূর্ব দৃশ্য।

এমন সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই বিশাল আকাশ যেন মানুষের অন্তরেরই প্রতিচ্ছবি। কখনো নির্মল, কখনো মেঘমালায় আচ্ছন্ন; কখনো তারকারাজিতে উজ্জ্বল, কখনো অন্ধকারে নিমজ্জিত। ঠিক যেমন আবহাওয়ার পরিবর্তনে আকাশের রূপ বদলায়, তেমনি মানুষের মনও চঞ্চল ও পরিবর্তনশীল। ঈমান ও আমলের নূরে অন্তর আলোকিত হয়, আবার গুনাহ ও অবহেলায় তা কলুষিত হয়ে পড়ে।

মেঘের সংঘর্ষ ও অন্তরের দ্বন্দ্ব

আকাশে যখন দুটি মেঘপুঞ্জ পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখনই বর্ষণ নামে। তেমনি মানুষের সমাজে-পরিবারে, দলমত বা সংগঠনে-সংঘাতের উৎপত্তি হয় আমাদের অন্তরের গহীনে লুকিয়ে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে। এগুলো এক ধরনের আত্মিক রোগ।

শরীরের অসুখ হলে আমরা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হই, কিন্তু অন্তরের ব্যাধিগুলোর প্রতি আমাদের উদাসীনতা সত্যিই আশ্চর্যজনক। অথচ এই রোগগুলোই সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক। এদের প্রতিকারের একমাত্র পথ হলো কোরআন ও সুন্নাহর আলো, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও আত্মশুদ্ধির সাধনা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, এতিমের মাথায় হাত বোলানো, অসহায়কে সাহায্য করা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা-এসব আমল অন্তরকে কোমল ও পবিত্র করে।

হিংসা: এক ভয়ংকর ব্যাধি- আল-হালিকা

হিংসা (হাসাদ) ও বিদ্বেষ (বুগয) মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়। যেমন আগুন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে, তেমনি হিংসা সৎকর্মের স্তূপকে বিনষ্ট করে দেয়। নবী করিম (সা.) সতর্ক করে বলেছেন:

“তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে ভাই ভাই হয়ে যাও।”

হাদিসের ভাষায় এই হিংসা-বিদ্বেষকেই বলা হয়েছে “আল-হালিকা”- যার অর্থ এটি দ্বীনের শিকড় উপড়ে ফেলে, আমলকে ধ্বংস করে দেয়। এটি শুধু মাথার চুল মুণ্ডন নয়; বরং এটি ধ্বংস করে দেয় দ্বীনের মূল ভিত্তি।

সমাজ ও পরিবারে বিভক্তির মূল কারণ

আজ আমাদের সমাজ, পরিবার, এমনকি ধর্মীয় সংগঠনগুলোতেও বিভক্তি ও সংঘাত যেন নিত্যদিনের ঘটনা। এর পেছনের কয়েকটি প্রধান কারণ হলো: সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনে ব্যর্থতা (বিশেষ করে উত্তরাধিকার বণ্টনে শরিয়ত অমান্য)।

অহংকার ও পদমর্যাদার লোভ

অন্যকে হেয় করা ও অবজ্ঞা।

অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও হিংসাপরায়ণ চিন্তা।

বিশেষ করে উত্তরাধিকার বণ্টনে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করলে ভাইদের মাঝে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এবং সমাজকে দুর্বল করে তোলে।

ইসলাহ যাতুল বাইন: সম্পর্কের উন্নয়ন

এই ভয়ংকর রোগ থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়গুলো হলো:

১. অন্তর পরিশুদ্ধ করা (তওবা ও জিকিরের মাধ্যমে)

২. ক্ষমা ও উদারতা (অপরাধীকে মাফ করে দেওয়া)

৩. ধৈর্য ও সহনশীলতা (আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা)

৪. প্রজ্ঞা ও হিকমতের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানো

হাদিসে এসেছে, মানুষের মাঝে সম্পর্ক ঠিক করে দেওয়া নফল নামাজ ও রোজার চেয়েও উত্তম আমল।

যারা নীরব থাকে, তারা দুর্বল নয়- বরং অনেক সময় তারাই সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও প্রজ্ঞাবান। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গেলে সব পক্ষকে কিছুটা না কিছুটা ছাড় দিতে হয়, অন্যের মর্যাদা ও অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে হয়।

নির্মল হোক আমাদের হৃদয়

আমাদের হৃদয় যেন আকাশের মতো উদার ও প্রশস্ত হয়- হিংসা ও বিদ্বেষের আবিলতামুক্ত। আমরা যেন “আল-হালিকা” থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারি এবং “ইসলাহ যাতুল বাইন”-এর প্রতি যত্নবান হই। মুসলিম উম্মাহর শক্তি নিহিত আছে ঐক্যে। ঐক্যবদ্ধ থাকলেই সম্ভব শান্তি, সমৃদ্ধি ও সফলতা।

হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরসমূহ পবিত্র করে দিন এবং আমাদেরকে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐক্যের পথে পরিচালিত করুন।

নবীজি সা. ইরশাদ করেন, “তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই তা আল-হালিকা। আমি বলি না তা চুল বা কেশ মুণ্ডন করে দেয়, বরং দ্বীনকে সমূলে উৎপাটিত (ধ্বংস) করে দেয়।”

লেখক: পরিচালক, সেন্টার ফর স্পিরিচুয়াল স্টাডিজ, ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন