Logo

ধর্ম

শ্রমিকের অধিকার ও ইসলাম

Icon

এম. আজগর সালেহী

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ১৪:২৭

শ্রমিকের অধিকার ও ইসলাম

মানবসভ্যতার সূচনা থেকে শ্রম মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান। শ্রম ছাড়া উৎপাদন নেই, উন্নয়ন নেই, সভ্যতার অগ্রযাত্রাও নেই। কৃষক, মজুর, কারিগর, নির্মাণশ্রমিক, শিল্পশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, সকলের ঘাম ও পরিশ্রমের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক পৃথিবী। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শ্রমজীবী মানুষই যুগে যুগে শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে।

বিশ্বের নানা মতবাদ শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। কেউ বিপ্লবের ডাক দিয়েছে, কেউ আইন করেছে, কেউ আন্দোলন করেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ, ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক শ্রমনীতি দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম শ্রমকে ইবাদত, শ্রমিককে সম্মানিত মানুষ এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়কে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

শ্রম দিবসের ইতিহাস:

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মারক। উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকদের দিনে বারো থেকে ষোল ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। মজুরি ছিল অপ্রতুল, কাজের পরিবেশ ছিল অমানবিক।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট আন্দোলনে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সে আন্দোলনে বহু শ্রমিক নিহত হন। শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। পরে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, শ্রমিকের অধিকার কখনো দয়া করে দেওয়া হয়নি, সংগ্রামের মাধ্যমে আদায় করতে হয়েছে।

শ্রমিকদের সমাজে অবদান:

সমাজের প্রতিটি অগ্রগতির পেছনে রয়েছে শ্রমিকের অবদান। মাঠে কৃষকের শ্রম না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নেই। কারখানার শ্রমিক ছাড়া শিল্প অর্থনীতি চলে না। নির্মাণ শ্রমিক ছাড়া শহর গড়ে ওঠে না। পরিবহন শ্রমিক ছাড়া বাণিজ্য ও যোগাযোগ অচল হয়ে পড়ে।

আল্লাহ বলেন, মানুষের জন্য তাই আছে, যার জন্য সে চেষ্টা করে। (সূরা আন নাজম, আয়াত ৩৯) এই আয়াত প্রমাণ করে, শ্রম শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি মর্যাদার বিষয়। শ্রমিক সমাজের বোঝা নয়, বরং সমাজের চালিকাশক্তি। তাদের অবদান অস্বীকার করা মানে সভ্যতার ভিত্তি অস্বীকার করা।

পুঁজিবাদীদের খপ্পরে শ্রমিক ও শ্রম:

আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমকে অনেক সময় শুধু উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়। শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা নয়, মুনাফাই হয়ে ওঠে মুখ্য। এর ফলে মালিকের সম্পদ বাড়ে, শ্রমিক বঞ্চিত থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দেওয়া হয় না, অতিরিক্ত কাজ করানো হয়, নিরাপত্তা দেওয়া হয় না, শ্রমের মূল্য কমিয়ে দেখা হয়। আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৮) এই আয়াত শ্রমিক শোষণ ও অন্যায় মুনাফার বিরুদ্ধে ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। পুঁজিবাদ শ্রমকে বাজারে বিক্রয়যোগ্য বস্তু বানালেও ইসলাম শ্রমিককে মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে দেখে।

গণতন্ত্রের বেড়াজালে শ্রমিক অধিকার:

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো শ্রমিক অধিকারের নানা আইন প্রণয়ন করেছে। শ্রম আইন, ট্রেড ইউনিয়ন, ন্যূনতম মজুরি, সবই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক অধিকার কাগজেই সীমাবদ্ধ।

নির্বাচনের সময় শ্রমিকদের নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, পরে তারা অবহেলিত হয়। শ্রমিক আন্দোলন অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে পড়ে। আইন থাকলেই অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না। ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়িত হয় না।

চলমান বিশ্বে শ্রমিকদের অবহেলা:

প্রযুক্তি ও উন্নয়নের যুগেও বিশ্বে কোটি কোটি শ্রমিক আজ বঞ্চিত। কোথাও অপ্রতুল মজুরি, কোথাও নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ, কোথাও অভিবাসী শ্রমিকের মানবেতর জীবন। শিল্প দুর্ঘটনা, গার্মেন্টস ট্রাজেডি, বিদেশে শ্রমিক নির্যাতন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব, সবই চলমান বাস্তবতা। সভ্যতার অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন শ্রমিকের জীবনও মর্যাদাপূর্ণ হয়। অন্যথায় উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।

সাহাবায়ে কেরামের জীবনে শ্রমিকের অধিকার:

ইসলামের ইতিহাসে শ্রমকে কখনো হীন মনে করা হয়নি। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে শ্রম দিয়েছেন। তিনি পশু চরিয়েছেন, ব্যবসা করেছেন, খন্দক খননে অংশ নিয়েছেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যক্তি নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি। (সহিহ বুখারি) তিনি আরও বলেছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (ইবনে মাজাহ)

হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় কঠোর ছিলেন। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ হাতে পরিশ্রম করতেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবন প্রমাণ করে, শ্রম সম্মানের, শোষণ নয়।

ইসলাম একমাত্র শ্রমিক অধিকারের গ্যারান্টি:

ইসলাম শ্রমিক অধিকারের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দিয়েছে। ন্যায্য মজুরি, মানবিক আচরণ, শোষণমুক্ত সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও মর্যাদা, সবই ইসলামের শিক্ষা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কর্মচারীরা তোমাদের ভাই। (সহিহ বুখারি)

তিনি আরও বলেছেন, তোমরা তাদেরকে তাই খাওয়াও যা নিজেরা খাও, পরাও যা নিজেরা পর। (সহিহ মুসলিম) এ শিক্ষা শুধু অধিকার নয়, ভ্রাতৃত্বেরও ঘোষণা।

আল্লাহ বলেন, তোমরা ওজনে কম দিও না।  (সূরা আর রহমান) এটি শুধু বাণিজ্যে নয়, শ্রমিকের হক আদায়েও প্রযোজ্য।

ইসলাম মালিক ও শ্রমিকের সংঘাত চায় না, চায় ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক। শ্রমিক সমাজের প্রান্তিক কোনো শ্রেণি নয়, বরং সভ্যতার নির্মাতা। তাদের ঘামে গড়ে ওঠে পৃথিবী, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। নানা মতবাদ শ্রমিক অধিকারের কথা বললেও শোষণহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাধান দিয়েছে ইসলাম।

ইসলাম শিখিয়েছে শ্রম ইবাদত, শ্রমিক সম্মানিত, শ্রমিকের অধিকার আদায় দায়িত্ব। যে সমাজ শ্রমিকের মর্যাদা দেয় না, সে সমাজ ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।

আজ প্রয়োজন শুধু শ্রম দিবস পালন নয়, শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা। শোষণ নয়, ইনসাফ। বঞ্চনা নয়, মর্যাদা। আর সেই পথের দিশা দেয় ইসলাম।

শ্রমিকের ঘামকে সম্মান করা, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। এই চেতনা জাগ্রত হোক ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন