আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি, মেঘের গর্জন আর বজ্রপাত- এই দৃশ্য মানুষের হৃদয়ে ভয় ও বিস্ময় জাগায়। আধুনিক বিজ্ঞান এর কারণ ব্যাখ্যা করলেও একজন মুমিনের কাছে এটি শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর কুদরত, সতর্কবার্তা এবং রহমতের নিদর্শন। এই ভয়াবহ মুহূর্তগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষ কতটা অসহায়, আর আল্লাহ কত মহান।
বজ্রপাত কেন হয়? (বৈজ্ঞানিক ও ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি)
বৈজ্ঞানিকভাবে মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে গিয়ে হঠাৎ নির্গত হলে বজ্রপাত ঘটে। কিন্তু কোরআন আমাদের এই ঘটনাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়:
“তিনিই তোমাদেরকে বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং তিনি ভারী মেঘ সৃষ্টি করেন।” (সূরা আর-রূম: ২৪)
আরও বলা হয়েছে: “বজ্র তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারা তাঁর ভয়ে তাসবিহ করে...” (সূরা আর-রাদ: ১৩) অতএব, বজ্রপাত কেবল প্রকৃতির খেলা নয়; এটি আল্লাহর মহিমা ও ক্ষমতার জীবন্ত প্রকাশ।
ঝড়-তুফান ও বজ্রপাতের সময় করণীয়
ঝড়-তুফান বা বজ্রপাতের সময় রাসুল (সা.) আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল শিখিয়েছেন।
১. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা
প্রবল বাতাস বা ঝড় শুরু হলে পড়তে হবে: উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খয়রাহা, ওয়া খয়রা মা ফীহা, ওয়া খয়রা মা উরসিলাত বিহি; ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা, ওয়া শাররি মা ফীহা, ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর কল্যাণ চাই, এর মধ্যে যা রয়েছে তার কল্যাণ চাই এবং এটি যে উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ চাই। আর আমি আপনার কাছে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই, এর মধ্যে যা রয়েছে তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই এবং এটি যে উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৯৯)
২. বজ্রের শব্দ শুনলে দোয়া
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহী ওয়াল মালাইকাতু মিন খীফাতিহ।
অর্থ: পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর প্রশংসাসহ বজ্র তাসবিহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারা তাঁর ভয়ে তাসবিহ করে। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ১৭২২)
৩. ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নামাজ ও তওবা করা
হাদিসে এসেছে: “যখন নবী (সা.) ভয়াবহ কিছু দেখতেন, তখন তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। তাই এই সময় বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার, নফল নামাজ ও দান-সদকা করা উচিত।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তব উপায়
ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক নয়, বাস্তব জীবনেও সতর্ক হতে শিক্ষা দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন; “প্রথমে তোমার উটকে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (সুনান তিরমিজি)।
করণীয়:
১. খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা পানির কাছ থেকে দূরে থাকা।
২. নিরাপদ ঘরে আশ্রয় নেওয়া।
৩. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা।
৪. ধাতব বস্তু ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
অসহায় মানুষ ও পশুপাখির প্রতি দায়িত্ব
ঝড়-তুফানে দরিদ্র মানুষ ও অবলা প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন; “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে মানুষের জন্য বেশি উপকারী।” (সহিহ মুসনাদ আহমাদ)।
মানুষের জন্য: আশ্রয়হীনদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া এবং খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া।
পশুপাখির জন্য: গবাদি পশু নিরাপদ স্থানে রাখা এবং তাদের খাবার ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। “প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া করলে সওয়াব রয়েছে।” (সহিহ বুখারি)।
উপসংহার
বজ্রপাত ও ঝড়-তুফান আমাদের জন্য ইমানের পরীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ। এই সময় আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা এবং আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসাই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক; মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ।

