বাইতুল্লাহ: নির্মাণ ইতিহাস ও নবীগণদের ইবাদত
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১৩:৫১
পবিত্র কাবা শরীফ মুসলিম উম্মাহর প্রথম কিবলা, পৃথিবীর প্রথম ইবাদতগৃহ এবং তাওহিদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক। মুসলমানরা প্রতিদিন নামাজে এ ঘরের দিকেই মুখ করে দাঁড়ায়। কাবাকে ঘিরে বহু প্রচলিত গল্প সমাজে রয়েছে, কিন্তু ইসলামে সত্য যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড হলো আল-কোরআন ও সহিহ হাদিস। তাই কাবা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে প্রথম নির্মাণ করেন, ইবরাহিম (আ.)-এর ভূমিকা কী, সব নবী কি হজ করেছেন, এবং লোকমুখে প্রচলিত নানা কাহিনির সত্যতা-এসব বিষয়ে দলিলভিত্তিক আলোচনা জরুরি।
কাবা নির্মাণের পর অবশিষ্ট পাথর পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া- এ কথা কি সত্য?
সমাজে প্রচলিত আছে যে, হযরত ইবরাহিম (আ.) কাবা নির্মাণের পর অতিরিক্ত পাথর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নিক্ষেপ করেন, আর যেখানে সেই পাথর পড়ে সেখানে কিয়ামতের আগে মসজিদ হবে। এ দাবির পক্ষে কোরআন বা কোনো সহিহ হাদিসে কোনো প্রমাণ নেই।
কোরআনের দলিল: আর যখন ইবরাহিম ও ইসমাঈল এ ঘরের ভিত্তি উঁচু করছিল...-(সুরা আল-বাকারা:১২৭) এখানে নির্মাণের কথা আছে, কিন্তু অতিরিক্ত পাথর ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো কথা নেই। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি-কোথাও এ ধরনের বর্ণনা নেই। অতএব এটি লোককথা, ইসলামি আকিদা নয়।
কাবা শরীফ সর্বপ্রথম কে নির্মাণ করেন
কোরআনের দলিল: নিশ্চয়ই সর্বপ্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই বাক্কায় (মক্কায়), বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত।-(সুরা আল ইমরান:৯৬)
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা: এ আয়াত প্রমাণ করে কাবা মানবজাতির প্রথম ইবাদতের ঘর। সহিহ হাদিসে ফেরেশতারা কাবা নির্মাণ করেছেন-এমন সরাসরি বর্ণনা নেই।
অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, আদম (আ.) প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন।
ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুনর্র্নিমাণ করেন।
কোরআনের আরেক দলিল: আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পাক সাফ রাখবে তাওয়াফকারী, রুকূ-সিজদা ও দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর জন্য’। -(সুরা আল-হাজ্জ:২৬)
ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ
আর (স্মরণ কর) যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কাবাগৃহের ভিত্তি তুলছিল, তখন প্রার্থনা করল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা’।-(সুরা আল-বাকারা:১২৭) এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানায়, তাঁরা ভিত্তি পুনরুত্থান করেন।
হজ কবে থেকে শুরু
কোরআন: আর মানুষের মাঝে হাজ্জের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে, আর সব (পথক্লান্ত) শীর্ণ উটের পিঠে, বহু দূরের গভীর পর্বত সংকুল পথ বেয়ে।-(সুরা আল-হাজ্জ:২৭) এ আয়াত প্রমাণ করে, হজ ইবরাহিম (আ.)-এর যুগ থেকেই ফরজ ইবাদতের ভিত্তি পায়।
পূর্ববর্তী নবীরা কি হজ করেছেন
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন: আমি যেন মূসা ইবনে ইমরান (আ.)-কে দেখতে পাচ্ছি, তিনি লাল বালুর টিলার পথ দিয়ে তালবিয়া পড়তে পড়তে অতিক্রম করছেন।-(সহিহ মুসলিম: ১৬৬) এটি প্রমাণ করে, মূসা (আ.)-এর হজ বা তালবিয়ার সম্পর্ক ছিল।
আবু যার (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম: পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত?
রাসুল (সা:) বললেন: মসজিদুল হারাম। আমি বললাম: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: মসজিদুল আকসা। আমি বললাম: দুইটির মধ্যে কত ব্যবধান? তিনি বললেন: চল্লিশ বছর।-(সহিহ বুখারি: ৩৩৬৬; সহিহ মুসলিম: ৫২০)
কাবায় প্রথম ইমামতি কে করেন
কোরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে প্রথম ইমাম হিসেবে কোনো নাম নেই। তবে ইবরাহিম (আ.)-কে কাবার সঙ্গে সালাত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
দলিল: আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকুককারী ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।-(সুরা আল-বাকারা:১২৫)
রাসুলুল্লাহ (সা:) কাবায় কী করেন
মক্কা বিজয়ের দিন নবী (সা:) কাবাঘরে প্রবেশ করেন, মূর্তি অপসারণ করেন এবং তাকবির দেন। -(সহিহ বুখারি: ১৬০১) তিনি কাবাকে পুনরায় তাওহিদের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
কিয়ামতের আগে কাবার কী হবে
রাসুল (সা:) বলেন: যুস-সুওয়াইকাতাইন (হাবশার চিকন পায়ের এক ব্যক্তি) কাবা ধ্বংস করবে।-(সহিহ বুখারি: ১৫৯১,-সহিহ মুসলিম: ২৯০৯)
ইমাম মাহদি ও কাবা
আব্দুল্লাহ (রা:) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি দুনিয়ার মাত্র একদিনও অবশিষ্ট থাকে তবে আল্লাহ সেই দিনকে অত্যন্ত দীর্ঘায়িত করবেন এবং আমার থেকে অথবা আমার পরিজন থেকে একজন লোক আবির্ভূত করবেন, যার নাম ও তার পিতার নাম আমার ও আমার পিতার নামের সঙ্গে হুবহু মিল হবে। সে পৃথিবীকে ইনসাফে পরিপূর্ণ করবে যেরূপ তা যুলুমে পরিপূর্ণ ছিলো। আর সুফিয়ান বর্ণিত হাদিসে বলেন, ততদিন দুনিয়া ধ্বংস হবে না, যতদিন পর্যন্ত আমার পরিবারের এক ব্যক্তি আরবে রাজত্ব না করবে, তার নাম হুবহু আমার নামই হবে।-(সুনান আবু দাউদ: ৪২৮২) বর্ণনায় আছে, তাঁর হাতে কাবার নিকটে বায়আত হবে। তবে শেষ ইমাম সম্পর্কে সহিহ নির্দিষ্ট বর্ণনা নেই।
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
কাবা কিবলা:-(সুরা আল-বাকারা:১৪৪) “ কাবা নিরাপদ স্থান:-(সুরা আল-মায়িদা:৯৭)” তাওয়াফ:-(সুরা আল-হাজ্জ:২৯)
পরিশেষে বলা যায় :-পবিত্র কাবা শরীফ মানবজাতির জন্য আল্লাহ নির্ধারিত প্রথম ইবাদতগৃহ, যা তাওহিদ, হিদায়াত ও মুসলিম ঐক্যের কেন্দ্র। কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী- এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম ইবাদতের ঘর (সুরা আলে ইমরান: ৯৬)। আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) কাবার ভিত্তি পুনর্র্নিমাণ করেন (সুরা আল-বাকারা: ১২৭), এবং তাঁদের মাধ্যমেই হজের মহান আহ্বান মানবজাতির কাছে পৌঁছে যায় (সুরা আল-হাজ্জ: ২৭)। সহিহ হাদিসে বহু নবীর হজের ইঙ্গিত পাওয়া যায় (সহিহ মুসলিম: ১৬৬), আর কিয়ামতের পূর্বে কাবা ধ্বংসের ঘটনাও রাসুলুল্লাহ (সা:) বর্ণনা করেছেন (সহিহ বুখারি: ১৫৯১)।
অন্যদিকে, কাবা নির্মাণের পর অবশিষ্ট পাথর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া, সেই স্থানগুলোতে কিয়ামতের আগে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হওয়া, সব নবী-রাসুলের নির্দিষ্টভাবে কাবা তাওয়াফ করা, কিংবা কাবায় প্রথম ও শেষ ইমামের নিশ্চিত পরিচয়-এসব বিষয়ে কোরআন বা সহিহ হাদিসে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। তাই এ ধরনের প্রচলিত লোককাহিনি ধর্মীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
মুসলমানের ঈমান, আকিদা ও আমলের ভিত্তি হওয়া উচিত কেবল আল্লাহর কিতাব ও রাসুল (সা:)-এর সহিহ সুন্নাহ। কারণ ইসলামে আবেগ বা শোনা কথা নয়, বরং বিশুদ্ধ দলিলই সত্যের মানদণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (সুরা আন-নাহল: ৪৩)
অতএব, কাবা শরীফ সম্পর্কে আমাদের দায়িত্ব হলো-প্রচলিত গল্পের পরিবর্তে কোরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক বিশুদ্ধ জ্ঞান গ্রহণ করা, যাতে আমাদের বিশ্বাস হয় শুদ্ধ, আমল হয় সহিহ, এবং আকিদা থাকে বিভ্রান্তিমুক্ত।
লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার

