Logo

ধর্ম

​তালেবে ইলমের জন্য শায়খ আব্দুল মালেকের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ

​ইলমের প্রতি মহব্বত ও নিমগ্নতা

Icon

শায়খ আব্দুল মালেক

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১২:৪২

​ইলমের প্রতি মহব্বত ও নিমগ্নতা

​মাওলানা আব্দুল মালেক (দা.বা.) বলেন, ​আল্লাহর শোকর আদায় করছি। বরকতপূর্ণ এ ইদারায় এসেছি। এক যুগ আগেও মাখযানে এসেছিলাম। আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং মাদরাসার মাহাওয়ালের (পরিবেশের) সাথে সম্পৃক্ত থাকা জরুরি। নিজের মাহাওয়ালের ভেতর থাকলে ঈমান-আমল ঠিক থাকে। আমাদের ইলমি-আমলি পরিবেশে থাকতে হবে।

​তালেবে ইলমদের খেদমতে আরেকটি কথা মাওলানা মুহাম্মদ তাকী উসমানী সাহেবের ভাষায় বলি: "আজকাল আমাদের ভেতর কানাআত (অল্পে তুষ্টি) আসে ঠিকই, কিন্তু ইলমের ক্ষেত্রে কোনো কানাআত নেই।"

​কানাআতের বিপরীত শব্দ হলো ‘হিরস’ (লোভ বা প্রবল আকাঙ্ক্ষা)। আরবি কবি বলেছেন, ইলম ও আমলের হিরস থাকা চাই। ফারসি কবি বলেছেন, ‘হিরসে কুতাহ’— অর্থাৎ দুনিয়ার হিরস বা লালসা কম থাকা উচিত।

​শোকর সব ক্ষেত্রেই করতে হয়। তবে ইলমের ক্ষেত্রে বলতে হয়— “রাব্বি জিদনি ইলমা”। ইলম বাড়ানোর জন্য সব সময় দুআ করতে হবে। ইলমের ব্যাপারে কানাআত কাম্য নয়। দরস পড়লাম, তাকরার করলাম, মুতালায়া করলাম—এরপরও যদি কিছু সময় বাঁচে, তবে তা কাজে লাগাতে হবে। সেই সময়টুকু উস্তাযের সামনে পেশ করতে হবে। ইদাফি (অতিরিক্ত) মুতালায়াতে ওই সময় কাজে লাগালে উস্তাযের ‘তায়সির’ (সহজীকরণ) থেকে অনেক কিছু হাসিল হবে।

​মাদরাসার সময়টা ‘আজাদী’ বা যাচ্ছেতাই করার সময় নয়। নাশাতের (প্রফুল্লতার) সময়টাও উস্তাযের পরামর্শে কাজে লাগাতে হবে। মনচাহি মতো সময় কাটানো যাবে না। অন্যের প্রশংসা বা ভালো ফলাফলের কারণে আমরা অনেক সময় নিজের হাকিকত (প্রকৃত অবস্থা) ভুলে যাই।

​কোনো ছাত্রই খারাপ নয়; কিন্তু ‘ভালো’র অর্থ বুঝতে হবে। সালাহ (যোগ্যতা) ও সুলুহ (সংশোধন) থাকলেই সে ভালো। সালাহিয়াত ও সুলুহিয়াত থাকলে সে হয় নেককার। আদব শিখতে হবে। বড়দের মজলিসে কথা বললে অনুমতি নিতে হবে এবং আদবের সাথে সামনে থাকতে হবে।

​হিলম (সহনশীলতা) ও বুরদবারি (ধৈর্য) শিখতে হবে। উজলতপছন্দি (একাকী থাকা বা বিচ্ছিন্নতা) ভালো নয়। আমাদের নিজের ভেতরের খামতি ও ত্রুটিগুলো দেখতে হবে। দিল ও দেমাগকে ইলমের জন্য ফারেগ (খালি) করতে হবে। ‘নেসাব’ একটি সময়ের নাম, আর ‘তাফাক্কুহ’ (গভীর বুঝ) হচ্ছে মানজিল বা লক্ষ্যস্থান। বছর শেষ, কিতাব শেষ—কিন্তু আপনি তালেবে ইলম হিসেবে কোথায় পৌঁছালেন?

​নাহবেমীর পড়ে আরবি ইবারত ও যেকোনো আরবি কিতাব পড়তে পারলেই সে ভালো ছাত্র। নাহবেমীর পড়ার পর আমরা কানযের ইবারত পড়েছি। চিন্তার ইসলাহ করতে হবে। যাকে ভবিষ্যতের চিন্তা পেরেশান করে, সে ভালো ছাত্র হয় কীভাবে?

​জামাতে কিতাব শেষ হলো, কিন্তু আমার কতটুকু হাসিল হলো তার মুহাসাবা (হিসাব) করতে হবে। মনে রাখতে হবে— “মান জাদ্দা ওয়াজাদা” (যে চেষ্টা করে, সে সফল হয়)। কোনো বিষয়কে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন: “লাইসা ফিল ইলমে খাফিফ” (ইলমের কোনো অংশই তুচ্ছ নয়)।

​ইলমের লজ্জত (আস্বাদ) পেলে মোবাইলের যুগেও বড় কিছু হওয়া সম্ভব। শেষরাতে জেগে ওঠার স্বাদ পেলে আর কোনো বাধা মানে না। ইলমকে ‘বোঝা’ বানানো যাবে না। মহব্বতের বন্দিখানায় কেউ আজাদ নয়; মহব্বতের ঠিকানা জান্নাত। "মকতবে ইশক আন্দাজে নিরালা।"

​"মনোযোগ নেই"—এটি কোন দেশি রোগ, তা পুরোনো হুজুরগণ বুঝবেন না। মাদরাসার মাহাওয়ালে এ রোগ হয় কীভাবে, তা বোধগম্য নয়। আমার মন ইলমের জন্য; মন যদি ইলমে না থাকে, তবে মন কোথায়? মনোযোগ কিসে? দিলে ইলমের মহব্বত তৈরি করতে হবে। শুরু থেকেই ‘বুঝে পড়া’র অভ্যাস করতে হবে।

​ইলমের মহব্বতওয়ালাদের মজলিসে বসো, এতে ইলমের প্রতি মহব্বত বাড়বে। ইনহিমাকের (গভীর মনোযোগ) সাথে পড়তে হবে। মুতালায়ার সময় কেউ এলে লৌকিকভাবে হলেও সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে চোখ না ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। কারো আওয়াজের কারণে দিল সরে গেলেও জবরদস্তি করে চোখ কিতাবেই রাখতে হবে। এক সময় চোখ ও দিল—উভয়ই স্থির হয়ে যাবে।

​মোদ্দাকথা: দিলে ইলমের মহব্বত ও নিমগ্নতা পয়দা করতে হবে।

​দোয়া: হে আল্লাহ! আমাদের দিলে ইলমের মহব্বত দান করুন।

মাওলানা আব্দুল মালেক

মুহাদ্দিস, খতিব ও গবেষক

(অনুলিখন: লাবীব আব্দুল্লাহ)

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন