Logo

ধর্ম

টাইটানিক জাহাজ: দম্ভ ও গর্বের পরাজয়

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ১৭:০১

টাইটানিক জাহাজ: দম্ভ ও গর্বের পরাজয়

​আধুনিক সময়ের প্রমোদতরিগুলো একেকটি যেন প্রকৌশলের বিস্ময়। উঁচু ও বিশাল আকারের এই জাহাজগুলো হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে মহাসমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। এমন বড় জাহাজ বর্তমানে অনেক রয়েছে; 'আইকন অব দ্য সিজ' বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রমোদতরি। তবে টাইটানিক এককালে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত জাহাজ। একটি আধুনিক শহরে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা এই জাহাজগুলোতে বিদ্যমান থাকে; বরং তার চেয়েও বেশি বৈচিত্র্য থাকে। এতে সুইমিং পুল থেকে শুরু করে খেলাধুলার স্থানসহ সবকিছুই রয়েছে। টাইটানিকসহ এসব বিশাল জাহাজ মূলত মহান আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন। টাইটানিক জাহাজের করুণ পরিণতি মানুষের এই ভুল ভেঙে দিয়েছে যে, টাইটানিকের মতো 'অজেয়' জাহাজও ডুবতে পারে। এই ঘটনা অহংকারীদের অহমিকা চুরমার করে দিয়েছে।

মানুষের দম্ভ বনাম আল্লাহর ক্ষমতা

​তৎকালীন প্রচারমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এমন এক বিশ্বাস জন্মেছিল যে, টাইটানিক কখনো ডুবতে পারে না। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এক নাবিক দম্ভ করে বলেছিলেন— “এমনকি ঈশ্বরও এই জাহাজ ডুবাতে পারবেন না!” (নাউযুবিল্লাহ)। তারা এমনটি ভেবেছিল কারণ তারা আল-কোরআন ও আল্লাহর অসীম ক্ষমতায় বিশ্বাস করত না। টাইটানিক জাহাজ তার প্রথম যাত্রাতেই সলিলসমাধি লাভ করে। ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল মধ্যরাতে দুর্ভাগ্যক্রমে এক বিশাল বরফখণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষে এটি পানির তলায় তলিয়ে যায়। শত চেষ্টা করেও নাবিকেরা জাহাজটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। আর তারা পারবেই বা কী করে? ভাগ্যের ওপর তো আর মানুষের হাত থাকে না! মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তাঁরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জাহাজসমূহ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে বিচরণ করে।” (সূরা আর-রহমান: ২৪)।

কোরআনের আয়াতের জীবন্ত প্রতিফলন

​টাইটানিক মূলত তার করুণ পরিণতির জন্যই সবার স্মৃতিতে বারবার নাড়া দেয়। আল-কোরআনের সূরা ইয়াসিনের ৪১-৪৪ আয়াত ও সূরা রহমানের ২৪ নং আয়াত তিলাওয়াত করার সময় চোখের সামনে সেই টাইটানিক জাহাজডুবির চিত্র ভেসে ওঠে। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে কীভাবে ভোগ-বিলাসে মদমত্ত হয়ে থাকতে পারে? কূল-কিনারাশূন্য সাগরের মাঝে মানুষ কীভাবে নির্ভীকচিত্তে অবস্থান করে এবং শেষ পর্যন্ত তার পরিণতিই বা কী হয়—তার বড় প্রমাণ টাইটানিক।

​উদ্ধত টাইটানিকের আরোহীরা নিশ্চিত বিপদ জেনেও মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা না চেয়ে মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ায় আল্লাহ তাদের ওপর নাখোশ হন। তারা ভুলে গিয়েছিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো রক্ষাকর্তা নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা ইয়াসিনে স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:

​“আর তাদের জন্য আমার আরেকটি নিদর্শন এই যে, আমি তাদের বংশধরদেরকে নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম। আর আমি তাদের জন্য অনুরূপ বিভিন্ন বাহন সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আরোহণ করে। আর যদি আমি ইচ্ছা করি তবে তাদের ডুবিয়ে দিতে পারি, তখন তাদের নালিশ শোনার কেউ থাকবে না এবং তারা মুক্তিও পাবে না। কেবল আমার পক্ষ হতে রহমত এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ দেওয়া ব্যতীত।” (সূরা ইয়াসিন: ৪১-৪৪)

​অত্র আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় একজন প্রাবন্ধিক বলেছেন— “এই আয়াতগুলোতে সাগর ও মহাসাগরের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: যেসব জাহাজ সাগরে চলাচল করে তাতেও আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন রয়েছে। কারণ তিনি জলরাশিকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যাতে জাহাজগুলো ডুবে না গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে ট্রেন ও বিমানসহ আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজই প্রধান মাধ্যম। যদি আল্লাহ তায়ালা পানির এই বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তুলে নিতেন, তবে সব জাহাজ তলিয়ে যেত এবং তখন আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদের বাঁচাতে পারত না।”

​কাজেই আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন অহংকার না করি, কারণ তাতে আল্লাহর মহাক্রোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর আল্লাহ রাগান্বিত হলে বিভিন্ন প্রকার বিপদ-আপদ হাজির হবে।

প্রযুক্তির অসহায়ত্ব ও শিক্ষা

​টাইটানিক যখন ডুবছিল, তখন সেই সময়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী ইঞ্জিন আর বিশালাকার কাঠামো কোনো কাজেই আসেনি। এমনকি জাহাজটিতে পর্যাপ্ত লাইফবোট পর্যন্ত রাখা হয়নি এই দম্ভে যে, এটি তো কখনো ডুববে না! আল্লাহর ইচ্ছা যখন কার্যকর হয়, তখন মানুষের সমস্ত প্রযুক্তি মাকড়সার জালের মতো দুর্বল হয়ে পড়ে।

​আল্লাহ বলেন: “তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের স্পর্শ করবেই; যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যে অবস্থান করো...” (সূরা নিসা: ৭৮)। টাইটানিকের সেই বিলাসবহুল ক্যাবিন আর সোনা-রুপার পাত্রগুলো আজ সমুদ্রের তলায় মরিচা ধরা কঙ্কাল মাত্র। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কুদরতের সামনে অহংকার মিশ্রিত বিলাসিতার কোনো মূল্য নেই। মানবতার মুক্তির দূত রাসূল (সা.) বলেছেন— “আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে সংবাদ দেবো না? তারা হচ্ছে প্রত্যেক কঠোর প্রকৃতির, অহংকারী ও দাম্ভিক।” (সহিহ বুখারি)।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য সতর্কতা

​টাইটানিক কেবল একটি জাহাজডুবির ঘটনা নয়, এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের জন্য একটি সতর্কবাণী। বর্তমান বিশ্বেও মানুষ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মোহে পড়ে খোদাদ্রোহী হয়ে উঠছে। মানুষ ভাবছে মহাকাশ জয় ও বড় বড় স্থাপত্য তাদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, লুত (আ.)-এর জাতি বা আদ ও সামুদ জাতিও তাদের স্থাপত্যশৈলী ও শক্তির দম্ভ করেছিল, কিন্তু আল্লাহর আজাব থেকে তারা রেহাই পায়নি।

​সূরা গাফিরের ২৭ নম্বর আয়াতে এসেছে— “যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাসী নয়, এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” অহংকারের পরিণতি সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন— “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” জনৈক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মানুষ তো চায় যে তার কাপড় ও জুতো সুন্দর হোক। রাসূল (সা.) বললেন— “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” (সহিহ মুসলিম: ৯১)।

​উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, টাইটানিক জাহাজডুবি মহান আল্লাহর আয়াতেরই যথার্থ প্রতিফলন। এটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ তার মেধা দিয়ে জাহাজ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তাকে ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা কেবল আল্লাহর। আসুন, আমরা দম্ভ পরিহার করে মহান আল্লাহর দরবারে নতি স্বীকার করি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— “অহংকার আমার চাদর এবং মহিমা আমার ভূষণ; যে ব্যক্তি এ দুটির কোনোটি নিয়ে আমার সাথে টানাটানি করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সহিহ মুসলিম)।

লেখক: প্রাবন্ধিক

কামিল/এম.এ, সালনা, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন