Logo

ধর্ম

বাউল গান: সুস্থ সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি

Icon

রেজা কারিম

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ১৮:১২

বাউল গান: সুস্থ সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি

​বাউল গান যুগ যুগ ধরে বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহুকাল ধরে এ জাতীয় গান বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করে এসেছে এবং এখনো করছে। তবে বর্তমানে এর ধারা অতীতের চেয়ে অনেকটাই নিম্নমুখী এবং তা ক্রমে ক্রমে আরও হ্রাস পাচ্ছে। এর বহুবিধ কারণ রয়েছে। কতিপয় অনুমেয় কারণ নিচে আলোকপাত করা হলো:

​১. শিক্ষিত লোকজন সাধারণত বাউল গানের তেমন ভক্ত হন না।

২. বাউলরাও ঠিক আগের মতো সাধনায় লিপ্ত না হয়ে সাময়িকভাবে এ পেশায় আসেন।

৩. বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বাউল শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা বেশির ভাগ শিল্পীরই হয় না।

৪. ব্যান্ড, পপ ইত্যাদি জাতীয় গান যখন সারা পৃথিবী মাতাচ্ছে, তখন বাউল শিল্পী হওয়ার আগ্রহ খুব কম শিল্পীরই থাকে।

৫. তরুণ প্রজন্ম বাউল গানের প্রতি তেমন আকৃষ্ট নয়।

৬. বাউল গানের বেশির ভাগ আসর গ্রামেই বসে। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে পাড়ি দেওয়ায় বাউল গানের দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা কমেছে।

৭. আলেম-ওলামারা সাধারণত প্রচলিত বাউল গানের আসরের বিরোধিতা করেন।

​আমার আলোচনার বিষয় শেষোক্ত কারণটিকে কেন্দ্র করে। বাউল গান অবশ্যই একটি সংস্কৃতি, তবে এর খোলস অনেক ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতি দিয়ে নির্মিত। আর অপসংস্কৃতির মোড়কে আবদ্ধ থেকে এ গান ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পয়গাম যথার্থভাবে দিতে পারে না। পাশাপাশি বাউল গানে এমন কিছু গান আছে যেগুলো অশ্লীল কথাবার্তায় পূর্ণ। তবে এ রকম গান শুধু বাউল গানেই নয়, সব ধরনের গানেই দেখা যায়; যা কোনোভাবেই শুদ্ধ হৃদয়ের মানুষের কাছে কাম্য হতে পারে না। এসব গান যেমন বর্জনীয়, তেমনি ওই গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর বিরুদ্ধে সুস্থ সংস্কৃতির মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সংঘবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে হবে।
​বাউল গানে সাধারণত যেসব বিষয়ভিত্তিক গান অন্তর্ভুক্ত থাকে তা নিচে দেওয়া হলো (তবে এগুলোই সব নয়):
​১. আত্মতত্ত্ব ২. পরমতত্ত্ব ৩. নিগূঢ়তত্ত্ব ৪. দেহতত্ত্ব ৫. সৃষ্টিতত্ত্ব ৬. সংসারতত্ত্ব ৭. সাধনতত্ত্ব ৮. গুরুতত্ত্ব ৯. প্রেমতত্ত্ব ১০. মাতৃতত্ত্ব ১১. লোকতত্ত্ব ১২. দেশতত্ত্ব ১৩. বিরহতত্ত্ব।
​এগুলো বাউল গানের বিষয়ভিত্তিক নাম। এছাড়াও বাউল গানে বিচ্ছেদ ও পালাগানের প্রচলন অতিমাত্রায় রয়েছে।
​এখন দেখা যাক আলেমরা কেন বাউল গানের বিরোধিতা করেন। প্রথমত মনে রাখতে হবে—আলেমরা বাউল গানের সেই কথাগুলোর বিরোধিতা করেন না যেখানে স্রষ্টা ও সৃষ্টির তত্ত্ব সম্বলিত গভীর ভাব রয়েছে। তাঁরা মূলত বিরোধিতা করেন অশ্লীল গান, কথা এবং আনুষঙ্গিক পরিবেশের।

প্রধান কারণসমূহ:
​১. বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের ধরণ: বাউল গানে বাদ্যযন্ত্রের চরম ব্যবহার করা হয়। মানুষ গানের বাণীর চেয়ে বাজনার তালে বেশি আকৃষ্ট ও মুগ্ধ হয়। অনেক সময় বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ এত বিকট হয় যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ লোকেরা তাতে কষ্ট পান।

২. নারী বাউলদের পরিবেশনা: একটি বাউল গানের আসরে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। সেখানে একজন নারীর প্রকাশ্যে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ও নৃত্য করে গান পরিবেশন করা আলেমদের দৃষ্টিতে শরিয়তসম্মত নয়।

৩. অনৈতিক কর্মকাণ্ড: বাউল গানের আসরের আড়ালে অনেক সময় জুয়ার আসর বসে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এসব জুয়া নিয়ে অনেক সময় বড় ধরনের বিবাদও ঘটে।

৪. নেশার প্রভাব: আসরের আশেপাশে অনেক সময় প্রকাশ্যে ধূমপানসহ মদ, গাঁজা ইত্যাদি নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা ও ব্যবহার চলে। এসব কারণে মানুষের মধ্যে নৈতিক ও ঈমানি চেতনা হ্রাস পায়।

উপসংহার:

বেশিরভাগ বাউল গানের কথাই খুব সুন্দর ও গভীর। ইসলামি চিন্তাবিদদের গবেষণার মাধ্যমে যদি বাদ্যযন্ত্রের অপব্যবহার ও অনৈতিক পরিবেশ পরিহার করে বাউল গানের প্রচার করা সম্ভব হয়, তবে এটি অপসংস্কৃতির মোড়ক থেকে বেরিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির ধারায় ফিরবে। এতে করে দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণকামী মানুষ উপকৃত হতে পারবে।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়, রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন