নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রভাব
আবু আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১৫:০১
মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষা এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। ইসলাম নারী ও পুরুষের পারস্পরিক অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংজ্ঞায়িত করেছে। তবে সমাজকে কলুষমুক্ত রাখতে এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে ইসলাম নারী-পুরুষের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। বর্তমান বিশ্বায়ন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে এই অবাধ মেলামেশা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হলেও, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করছে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও পর্দার বিধান
ইসলামে নারী ও পুরুষের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ‘হিজাব’ বা পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি জীবনপদ্ধতি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিন পুরুষ ও নারী উভয়কে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
কোরআনের নির্দেশ:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন; “মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।” (সূরা আন-নূর: ৩০)
একইভাবে নারীদের উদ্দেশ্যে পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে; “আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে...” (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, অবাধ মেলামেশার প্রথম ধাপ হলো ‘দৃষ্টির অপব্যবহার’, যা ইসলাম শুরুতেই বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
অবাধ মেলামেশার পরিণাম ও হাদিসের সতর্কবাণী
অবাধ মেলামেশার ফলে সমাজে জিনা বা ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়। ইসলাম এমন প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিয়েছে যা মানুষকে পাপের দিকে ধাবিত করতে পারে।
হাদিসের উদ্ধৃতি:
১. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন; “কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে, যতক্ষণ না তার সাথে কোনো মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে হারাম) থাকে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
২. অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “যখনই কোনো পুরুষ ও নারী নির্জনে একত্রিত হয়, শয়তান সেখানে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উপস্থিত হয়।” (সুনানে তিরমিজি)
এটি বর্তমান যুগের তথাকথিত ‘ডেটিং’ বা অবাধ মেলামেশার ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে, যা ক্রমে বড় ধরনের পাপে রূপ নেয়।
সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা
অবাধ মেলামেশা সমাজের ওপর বিষবাষ্পের মতো কাজ করে। এর ফলে যে সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে-
পারিবারিক ভাঙন: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র ও একনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যাহত হয়। পরকীয়া এবং অবিশ্বাসের বীজ এখান থেকেই বপন হয়, যা শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদে গড়ায়।
নৈতিক স্খলন: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চারিত্রিক দৃঢ়তা হারিয়ে যায়। সস্তা বিনোদন এবং লালসার কারণে তারা পড়াশোনা ও গঠনমূলক কাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
নারীর অবমাননা: অবাধ মেলামেশার সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা প্রতারণার শিকার হন। পণ্যের মতো নারীকে উপস্থাপন করার প্রবণতা বাড়ে এবং নারীর প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
অপরাধ বৃদ্ধি: ধর্ষণ, ইভটিজিং এবং আত্মহত্যার মতো সামাজিক ব্যাধিগুলোর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা এবং পর্দার অভাব একটি বড় কারণ।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শালীনতা
ইসলাম নারীকে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অধিকার দেয়, তবে তা হতে হবে শালীনতা ও পর্দার গণ্ডির মধ্যে। নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র যদি আলাদা থাকে বা কাজের প্রয়োজনে যোগাযোগ হলেও যদি তা পর্দা ও গাম্ভীর্যের সাথে হয়, তবে সেখানে কাজের পরিবেশ সুন্দর থাকে। কিন্তু যেখানে কেবল বিনোদন বা অকারণে মেলামেশার পরিবেশ তৈরি হয়, সেখানে কাজের চেয়ে ফেতনা বেশি সৃষ্টি হয়।
আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মেলামেশার নতুন মাধ্যম
বর্তমান যুগে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা কেবল শারীরিক উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রযুক্তির কল্যানে এটি ডিজিটাল রূপ ধারণ করেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বিভিন্ন চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে পরপুরুষ ও পরনারীর সাথে অহেতুক কথা বলা, ছবি আদান-প্রদান এবং ভিডিও কল আধুনিক সমাজে এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পর্দার বিধান কেবল সরাসরি সাক্ষাতের জন্য নয়, বরং তা দৃষ্টি ও অন্তরের পবিত্রতার জন্য। ভার্চুয়ালি অপরিচিত বা গায়রে-মাহরাম ব্যক্তির সাথে অকারণে মেলামেশা ইমানের মিষ্টতা কেড়ে নেয় এবং অন্তরে কপটতা সৃষ্টি করে। নবী (সা.) বলেছেন, “চোখের জিনা হলো (হারাম) দৃষ্টিপাত করা এবং জিহ্বার জিনা হলো (কামভাব নিয়ে) কথা বলা।” (সহিহ মুসলিম)। সুতরাং প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মুমিনকে পর্দার সীমারেখা মেনে চলতে হবে।
মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও ভারসাম্যহীনতা
অবাধ মেলামেশার সুযোগ যেখানে বেশি, সেখানে মানুষের চারিত্রিক স্থিরতা কমে যায়। যখন নারী ও পুরুষ একে অপরের জন্য সহজলভ্য হয়ে পড়ে, তখন দাম্পত্য জীবনের প্রতি আকর্ষণ ও বিশ্বস্ততা হ্রাস পায়। এটি মানুষকে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়, যার ফলে সম্পর্কের কোনো স্থায়ী ভিত্তি থাকে না। ইসলামি শরিয়ত নারী ও পুরুষকে সামাজিক প্রয়োজনে কথা বলার অনুমতি দিলেও তা হতে হবে কর্কশতাহীন কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে নারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, “তোমরা কথা বলার সময় কোমলতা অবলম্বন করো না (পরপুরুষের সাথে), যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ না হয়; বরং তোমরা সংগত কথা বলো।” (সূরা আহজাব: ৩২)। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, অবাধ ও অনর্থক মেলামেশা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকে কলুষিত করে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার পথ প্রশস্ত করে।
পর্দার সুফল ও একটি পবিত্র প্রজন্ম
পর্দা ও মেলামেশার নিয়ন্ত্রণ যখন একটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই সমাজ থেকে পাপাচার ও অশান্তি দূর হয়ে যায়। এটি কেবল নারীকে সুরক্ষিত করে না, বরং পুরুষকেও একজন দায়িত্বশীল ও আত্মনিয়ন্ত্রিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। একটি শুদ্ধ ও পবিত্র প্রজন্ম বিনির্মাণে মা-বাবার আদর্শিক জীবন এবং পর্দার গুরুত্ব অপরিসীম। যখন ঘরে পর্দা ও লজ্জাশীলতার চর্চা থাকে, তখন সেখান থেকে হজরত ফাতেমা (রা.) ও হজরত আয়েশা (রা.)-এর মতো মহীয়সী নারীদের উত্তরসূরি তৈরি হয়। তাই আমাদের উচিত অবাধ মেলামেশার বিষফল পরিহার করে ইসলামের নূরানি পথে ফিরে আসা।
প্রতিকারের উপায়
একটি সুস্থ ও পবিত্র সমাজ বিনির্মাণে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
১. ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা: প্রতিটি পরিবারে শৈশব থেকেই সন্তানকে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা দিতে হবে এবং হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝাতে হবে।
২. পর্দার গুরুত্ব প্রচার: পর্দা যে নারীর জন্য বন্দিত্ব নয় বরং নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রতীক, তা সমাজের সকল স্তরে প্রচার করতে হবে।
৩. বিয়ের সহজীকরণ: সমাজে বিয়ের পথ সহজ ও সুন্দর করতে হবে, যাতে তরুণরা বিপথগামী না হয়ে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে উৎসাহিত হয়।
৪. সুস্থ বিনোদন: অশ্লিল সংস্কৃতি ও মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে তরুণদের দূরে রেখে সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
উপসংহার
নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা একটি সুন্দর সমাজের অন্তরায়। এটি সাময়িকভাবে আনন্দদায়ক মনে হলেও এর চূড়ান্ত ফল অত্যন্ত তিতা। ইসলাম যে পর্দার বিধান দিয়েছে, তা মূলত মানুষের আত্মিক প্রশান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। আমরা যদি পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করি এবং নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলি, তবেই একটি শান্তিময় ও সমৃদ্ধ জাতি গঠন সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের চারিত্রিক কলুষতা থেকে রক্ষা করুন এবং পর্দা ও শালীনতার পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম, প্রাবন্ধিক

