Logo

ধর্ম

রোজা ও ঈদের সময় নির্ধারণ

বৈশ্বিক ঐক্যের দাবি বনাম শরয়ি বাস্তবতা

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১৫:০৪

বৈশ্বিক ঐক্যের দাবি বনাম শরয়ি বাস্তবতা

ইসলামি উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও একত্ববোধের অন্যতম প্রতীক হলো রোজা ও ঈদ। এটি শুধুমাত্র একটি সামাজিক উৎসব নয়, বরং গভীর ইবাদত ও আল্লাহর নির্দেশ পালনের অংশ। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে- বিশ্বের সব মুসলমান কি একই দিনে রোজা শুরু ও একই দিনে ঈদ পালন করতে পারে?

এই প্রশ্নটি কেবল আবেগ বা ঐক্যের দৃষ্টিতে নয়; বরং শরিয়াহর দলিল, বাস্তবতা, ভৌগোলিক পার্থক্য ও ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

সমস্যার মূল কারণ ও বাস্তবতা

ইসলামে রোজা ও ঈদ নির্ধারণ হয় চাঁদ দেখার (রু’ইয়াতুল হিলাল) ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তব কিছু পার্থক্য রয়েছে-

* পৃথিবীর সময় অঞ্চল ভিন্ন

* সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একেক দেশে একেক সময়ে ঘটে

* চাঁদ একই সময়ে সব জায়গা থেকে দৃশ্যমান হয় না

* আবহাওয়া, মেঘ, দূষণ বা ভৌগোলিক বাধা চাঁদ দেখাকে প্রভাবিত করে

* পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির কারণে একই মুহূর্তে দিন-রাত ভিন্ন থাকে। ফলে একটি দেশে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে সেই মুহূর্তে তা দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই “একই দিনে বিশ্বব্যাপী ঈদ” বাস্তবে সবসময় সম্ভব নয়।

কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

আল্লাহ তাআলা ইবাদতের সময় নির্ধারণে প্রাকৃতিক চিহ্নকে ভিত্তি করেছেন। -(সূরা আল-বাকারা :১৮৫)

তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাস পায়, সে যেন রোজা রাখে...”

এখানে “মাস পাওয়া” বলতে চাঁদ দেখা বা চাঁদের সূচনা বোঝানো হয়েছে।-(সূরা ইউনুস: ৫) তিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য মনজিল (পর্যায়) নির্ধারণ করেছেন...”এই আয়াত থেকে বোঝা যায় চাঁদের গতি ও অবস্থান আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ, যা সময় নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।

হাদিসের নির্দেশনা

নবী (সা:) চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ইবাদত নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন।-(সহিহ বুখারি: ১৯০৯, সহিহ মুসলিম: ১০৮১) 

নবী (সা:) বলেছেন: তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো। যদি আকাশ মেঘলা থাকে তবে ৩০ দিন পূর্ণ করো।

আরেকটি হাদিস

আমরা উম্মি জাতি; লিখি না, গণনাও করি না। মাস এমনই এবং এমনই (কখনো ২৯, কখনো ৩০ দিন)।-(সহিহ বুখারি: ১৯১৩ ) এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয় যে শরিয়াহ চাঁদ দেখাকে ভিত্তি করেছে, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে নয়।

ফিকহি মতভেদ: একতা বনাম ভিন্নতা

ইসলামি ফিকহে এ বিষয়ে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে-

(ক) ইখতিলাফুল মাতালেয় (ভিন্ন অঞ্চল)

এই মত অনুযায়ী-* প্রতিটি অঞ্চলের চাঁদ দেখা আলাদা গণ্য হবে

* এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে অন্য দেশে তা বাধ্যতামূলক নয়

* স্থানভেদে ইবাদতের সূচনা আলাদা হতে পারে

 হানাফি, শাফেয়ি ও অধিকাংশ ফকিহ এই মত গ্রহণ করেছেন।

বাস্তব প্রয়োগেও এটি সবচেয়ে বেশি অনুসৃত।

(খ) ইত্তিহাদুল মাতালেয় (এক বিশ্ব)

এই মত অনুযায়ী-

* পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে সবাই গ্রহণ করবে।

* মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে এটি বলা হয়। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সময় পার্থক্যের কারণে এটি বাস্তবে প্রয়োগ কঠিন।

একই দিনে ঈদ পালনের দাবি কতটা বাস্তব?

সম্ভাব্য সুবিধা (তাত্ত্বিক)

* উম্মাহর ঐক্যের দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়

* মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগে একতা দেখা যায়

* একই দিনে উৎসব উদযাপনের আবেগ তৈরি হয়

বাস্তব সমস্যা

* পৃথিবীর সময় অঞ্চল ভিন্ন

* এক দেশে সূর্যাস্ত, অন্য দেশে সূর্যোদয়

* চাঁদ একই মুহূর্তে সর্বত্র দেখা যায় না

* শরিয়াহর “দেখার ভিত্তি” নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই এটি আবেগনির্ভর হলেও বাস্তব প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

শরিয়াহর মূলনীতি

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো- * আল-ইবারাহ বিল হাকিকাহ লা বিল ইফতিরাদ”

অর্থ: বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কল্পনার ভিত্তিতে নয়।

চাঁদ দেখা একটি বাস্তব, ভিজ্যুয়াল ও স্থানভিত্তিক ইবাদত। তাই এটি একক কেন্দ্রীয় ঘোষণা দ্বারা সব জায়গায় বাধ্যতামূলক করা শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

সাহাবিদের যুগের বাস্তব দৃষ্টান্ত

ইবনে আব্বাস (রা.) সিরিয়ায় চাঁদ দেখা সত্ত্বেও মদিনায় আলাদা দিনে রোজা পালন করেন। এটি প্রমাণ করে যে সাহাবিরা ভৌগোলিক পার্থক্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন।-(সহিহ মুসলিম: ১০৮৭ )

আধুনিক প্রযুক্তি ও শরিয়াহ

আজ স্যাটেলাইট, অ্যাস্ট্রোনমি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে চাঁদের অবস্থান আগেই জানা যায়। তবে-

* শরীয়াহ “দেখা”কে মূল ভিত্তি করেছে

* গণনা”কে বাধ্যতামূলক করেনি

* প্রযুক্তি সহায়ক হলেও এটি শরিয়াহর বিকল্প নয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ভিত্তি শরিয়াহর নিয়মেই হতে হবে।

উম্মাহর প্রকৃত ঐক্য কোথায়?

ঐক্য মানে শুধু একই দিনে ঈদ নয়, বরং-* ঈমান ও আকিদার একতা

* কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণ

* পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতা

* ফিতনা, বিভেদ ও হিংসা থেকে দূরে থাকা

* ইসলামের মূল নীতিতে ঐক্যবদ্ধ থাকা। ইসলাম বাহ্যিক সময়ের একতার চেয়ে অন্তরের ঐক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

পরিশেষে বলতে চাই, সব দিক বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-

চাঁদ দেখা স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। কোরআন ও হাদিস চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে ভিত্তি করেছে। সাহাবিদের যুগেও ভিন্ন দিন গ্রহণযোগ্য ছিল। ভৌগোলিক বাস্তবতা একই দিনে বিশ্বব্যাপী ঈদকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই “বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোজা ও ঈদ” ইসলামের বাধ্যতামূলক বিধান নয়, বরং এটি একটি প্রশাসনিক বা ঐক্যকেন্দ্রিক ধারণা হিসেবে আলোচিত হতে পারে।

মূল শিক্ষা হলো- ইসলাম আমাদের বাস্তবতা মেনে আল্লাহর বিধান অনুসরণ করতে শেখায়, কৃত্রিম একতা চাপিয়ে দিতে নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন, ইখলাস বৃদ্ধি করুন এবং উম্মাহর মাঝে প্রকৃত ঈমানি ঐক্য দান করুন। আমিন।

লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন