দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ঈদ। বছর ঘুরে ঈদ আসা মানেই তো চারদিকে আনন্দের হাওয়া, কেনাকাটার ধুম। নতুন জামা, সেমাই-পায়েসের মিষ্টি গন্ধ আর স্বজনদের বাড়ি যাওয়া—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম ভালো লাগা। কিন্তু সত্যি বলতে, এবারের ঈদের আনন্দটা সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। দিন দিন যেভাবে সব জিনিসের দাম বাড়ছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ঈদ আনন্দ এখন মস্ত বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারে গেলে এখন সাধারণ মানুষের হাত দেওয়ার উপায় নেই। চাল, ডাল, তেল তো আগে থেকেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। এখন ঈদের স্পেশাল রান্নার মাংস, পোলাওয়ের চাল, দুধ, সেমাই আর মসলার দামও আকাশছোঁয়া। মানুষের পকেটের আয় এক জায়গায় আটকে আছে, কিন্তু খরচের খাতা দিন দিন লম্বা হচ্ছে। শুধু খাওয়ার জিনিসই নয়, কাপড়ের বাজারে গেলে তো চোখ কপালে ওঠার দশা। একটা সাধারণ জামা কিনতে গেলেও চড়া দাম হাঁকা হচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষজন সন্তানদের মনের মতো একটা ঈদের জামা কিনে দিতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন।
আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এরা না পারে গরিব মানুষের মতো টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে সস্তায় পণ্য কিনতে, আর না পারে লোকলজ্জা ভুলে কারও কাছে হাত পাততে। কুরআন মাজিদে এই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষদের কথা এভাবেই বর্ণিত হয়েছে, "অজ্ঞ লোকেরা তাদের (মধ্যবিত্ত/অভাবী) আত্মসম্মানবোধ ও যাচনা না করার কারণে অভাবমুক্ত মনে করে; তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে, তারা মানুষের কাছে নাছোড়বান্দা হয়ে হাত পাতে না।" (সূরা বাকারা: ২৭৩)
নিজের সব শখ-আহ্লাদ মাটি দিয়ে তারা শুধু চেষ্টা করে সন্তানদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে। বুড়ো মা-বাবার জন্য একটা নতুন কাপড় আর ঈদের সকালে একটু ভালো মন্দ রান্নার আয়োজন করতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত মানুষ আজ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে ঈদের যে আনন্দ হওয়ার কথা ছিল, তা ঢাকা পড়ে গেছে সংসারের টানাটানির নিচে।
এই পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে এখনই বাজারে সরকারের শক্ত নজরদারি দরকার। ঈদ আসলেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। ইসলামে এই মজুদদারি ও সিন্ডিকেটকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি অধিক মূল্যে বিক্রির আশায় খাদ্যশস্য মজুদ করে, সে পাপী।" (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)
অন্য এক হাদিসে আছে, "মজুদদার অত্যন্ত মন্দ লোক"। এদের বিরুদ্ধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত এবং কঠোর অভিযান চালানো দরকার। সেই সাথে দেশের বড় ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদেরও একটু মানবিক হতে হবে। এই উৎসবের সময়ে অতিরিক্ত লাভ করার মানসিকতা বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা একটু ভাবা উচিত। ব্যবসায়ীদের স্মরণ রাখা উচিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, "সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গী হবেন।" (তিরমিজি: ১২০৯)
ঈদ আমাদের শুধু আনন্দ করতে শেখায় না, ঈদ আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। দেশের এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত লোকদেখানো কেনাকাটা আর বাড়তি অপচয় বন্ধ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনি ইসরাইল: ২৭)
মধ্যবিত্তের এই নীরব কান্না দূর করতে এবং ঈদের আলো সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজকে এখনই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই সবার জন্য ঈদ সত্যি আনন্দের হবে।
লেখক: আলেম, প্রাবন্ধিক; সুনামগঞ্জ, তাহিরপুর, বিন্নাকুলী

