১. ইসলামী অর্থনীতি ও যাকাতের গুরুত্ব
যাকাত ইসলামী অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ও মজবুত করে। যাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির মধ্যে অন্যতম ভিত্তি। যাকাত সুদভিত্তিক, পুঁজিবাদী, অমানবিক ও শোষণমূলক অর্থব্যবস্থার বিপরীতে একটি জনকল্যাণমূলক অর্থব্যবস্থা। যাকাতের উপকারিতা অনেক। এর ফলে যাকাতদাতার মাল বহুগুণে বৃদ্ধি পায় ও পবিত্র হয় এবং আল্লাহর আদেশ পালনার্থে জান্নাত লাভের পথ সুগম হয়। পবিত্র কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর তাদের (ধনীদের) সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।” (সুরা আয-যারিয়াত: ১৯)। অর্থাৎ যাকাত কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি ধনীদের সম্পদে দরিদ্রের প্রাপ্য অধিকার। তাফসীরে আহসানুল বায়ানে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “বঞ্চিত হলো এমন অভাবীরা, যারা চাওয়া থেকে বিরত থাকে। তাই পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও লোকেরা তাদেরকে দেয় না। অথবা এমন ব্যক্তি, যার সব কিছু আকাশ বা পৃথিবী থেকে আগত কোনো দুর্যোগ বা আপদে নষ্ট হয়ে গেছে।” এক কথায় বলা যায়, যারা সামর্থ্যবান ছিল কিন্তু কোনো কারণে তাদের সামর্থ্য চলে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও অভাবী হওয়া সত্ত্বেও তারা লোকলজ্জার ভয়ে অপরের কাছে চেয়ে বেড়ায় না। ফলে মানুষের সাহায্য থেকে বঞ্চিত থাকে। যেমন বলা যায়, এক সময়ের স্বচ্ছল পরিবার, যারা নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
২. লোকদেখানো মানসিকতা ও অবহেলা
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে ধনীরা যথাযথভাবে যাকাত দেন না। আর দিলেও, যদি যাকাত ফরজ হয় ১ লক্ষ টাকা বা ৫০ হাজার টাকা, তবে ঐ ব্যক্তি লোকদেখানোর জন্য কিছু শাড়ি, লুঙ্গি ও কাপড়-চোপড় কিনে দান করেন। তবে পরিপূর্ণ টাকার যাকাত দেন না। যার ফলে দেখা যায়, তারা তাদের যাকাতের সুফল পান না। তাই আমাদের মধ্যে যাদের এ অভ্যাস আছে, তাদের জরুরি ভিত্তিতে এসকল অন্যায় পরিত্যাগ করতে হবে। নয়তো আল্লাহর কঠিন আজাব ও গজব পতিত হবে।
এখন আমাদের নিজ উদ্যোগে যাকাত দেওয়া উচিত, কেননা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বড় উদ্যোগ নেই। যদি ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন থাকত তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আজ অনেক উন্নত হতো। যাকাত সঠিকভাবে আদায় করে সঠিক খাতে লাগানো হতো। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর সময় যখন কিছু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তখন তিনি কঠোরভাবে ঘোষণা করেছিলেন, “আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে যাকাত হিসেবে যে ব্যক্তি একটি উটের রশিও দিত, আজ যদি সে তা দিতে অস্বীকার করে, তবে তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করব।” (বুখারী শরীফ)। এটি প্রমাণ করে ইসলামী রাষ্ট্রে যাকাত আদায় করা কতটা বাধ্যতামূলক। যাকাত প্রদানে অস্বীকার করা মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর।
৩. পরকালের প্রতি অবিশ্বাস ও অবাধ্যতা
বড় বড় গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা ব্যবসায় ক্ষতির পেছনে নানাবিধ জাগতিক কারণ থাকলেও, যাকাত আদায় না করে সম্পদ অপবিত্র রাখাও বরকত চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়। মূলত যারা যাকাত দেয় না তারা পরকালের জবাবদিহিতাকে ভয় করে না। কারণ যদি তারা পরকালকে বিশ্বাস করত তবে অবশ্যই যাকাত দিত। যারা সামর্থ্য থাকার পরও কৃপণতাবশত যাকাত দেয় না, তারা মহাপাপী বা ফাসেক হিসেবে গণ্য হয়। আবার যদি অস্বীকার করে তাহলে তো কাফির। তাদের যে কী শাস্তি হবে তার বর্ণনা নিম্নে আছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: “আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ। যারা যাকাত দেয় না এবং পরকালকে বিশ্বাস করে না। তারাই কাফির।” (সুরা হা-মীম সাজদাহ, আয়াত নং: ৬-৭)
৪. ইবাদত কবুল না হওয়া ও ঘৃণিত হওয়া
এ আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, অন্যান্য ইবাদত তথা নামাজ, রোজা ও হজ পালন করলেও এটাকে অবিশ্বাস বা অমান্য করলে সে কাফির। আর ঐগুলোর পাশাপাশি যাকাতের উপযুক্ত হলে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে, এর বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যাকাত না দিলে সেই মাল অপবিত্র ও হারাম হয়ে যায়। পার্থিব জীবনের সকল মাল-সম্পদ হতে আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চলে যায়। আর সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত বান্দা হিসেবে গণ্য হয়।
সে যখন ঐ হারাম মাল দ্বারা তার পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করবে, তখন তাদের কারও ইবাদত কবুল হবে না। কারণ এমন হারাম সম্পদ দ্বারা গড়া শরীরের ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না। বরং সেই শরীর থাকবে জাহান্নামের মধ্যে। ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো হালাল খাবার খাওয়া।
৫. সম্পদের কঠিন শাস্তি
কুরআনে এসেছে— “যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা ব্যয় না করে জমিয়ে রাখে, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন ঐ সম্পদগুলোকে জাহান্নামের আগুনে গরম করে তাদের কপাল, পাঁজর, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে এবং বলা হবে— এখন সম্পদের স্বাদ গ্রহণ করো, যা তোমরা জমা করেছিলে।” (সুরা আত-তাওবাহ: ৩৪ ও ৩৫)
অত্র আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, যেটুকু সম্পদ দান করা উচিত, সে পরিমাণ সম্পদ দান করে দেওয়া অতীব জরুরি। নয়তো দুনিয়ার সুখ দেখতে গিয়ে অল্প সম্পদের জন্য পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। শুধু শাস্তিই নয়, বরং অপমানজনক শাস্তি যা নিম্নের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী—
অর্থ: “মহান আল্লাহ যাদেরকে অনুগ্রহ করে যে সম্পদ দান করেছেন, তা নিয়ে তারা কৃপণতা করে। তারা যেন এটা মনে না করে যে, এটা তাদের জন্য কল্যাণজনক; বরং এটা তাদের জন্য অকল্যাণজনক। অচিরেই কিয়ামতের দিবসে তা তাদের ঘাড়ে শিকলের ন্যায় পরিয়ে দেওয়া হবে, যার ব্যাপারে তারা কৃপণতা করছে।” (সুরা আল ইমরান: ১৮০)
৬. সম্পদ ধ্বংসের কারণ
যাকাত দেওয়ার ফলে মাল পবিত্র হয়। আর না দেওয়ার ফলে মাল মালকেই ধ্বংস করে ফেলে, যার প্রমাণ নিম্নের হাদিস: “হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে সম্পদে যাকাতের সংমিশ্রণ হবে, অবশ্যই যাকাত ঐ সম্পদকে ধ্বংস করে দেবে।” (মেশকাতুল মাসাবিহ-১৭৯৩, শাফেয়ী)
উক্ত হাদিস বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় সেটা হলো— এখানে যাকাতের মাল মিশ্রণ বলতে অন্যের নিকট হতে যাকাতের মাল নিয়ে এসে নিজের মালের সাথে মিশানো বুঝায়নি; বরং যাকাত না দেওয়ার ফলে ঐ মালটুকুই যে আসল সম্পদের সাথে মিশে রইল, সেটিই এখানে বুঝানো হয়েছে। এর প্রমাণ অনেক ব্যবসায়ী যারা আজ নিঃস্ব অথবা একের পর এক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অথচ তারা এটাকে ভাগ্য বলে চাপিয়ে দিয়ে চলেছে। কিন্তু কখনো এটা বোঝার চেষ্টা করে না যে কেন বারবার এমন হচ্ছে। আমাদের গার্মেন্টস কারখানা ও বড় বড় মিল-ফ্যাক্টরিগুলোতে অগ্নিকাণ্ড বা লোকসানের পেছনে যাকাত আদায় না করার কারণে সম্পদের বরকত চলে যাওয়া একটি অন্যতম কুফল। কেননা, যদি খোঁজ নেওয়া হয় তবে দেখা যাবে অনেক ব্যবসায়ী বা মিল-মালিকগণ সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করেন না। যাইহোক এতক্ষণ যে শাস্তিগুলোর বিষয়ে আলোচনা করলাম এগুলো হলো দুনিয়ার শাস্তি। এখন পরকালীন শাস্তির ব্যাপারে নিম্নে কিছু তুলে ধরব।
৭. সাপের আকৃতিতে সম্পদের শাস্তি
আর পরকালের শাস্তির প্রসঙ্গে আমরা সবাই জানি দুনিয়ার চেয়ে পরকালের শাস্তির তীব্রতা কোটি কোটি গুণ বেশি হবে। আমরা দুনিয়ার ছোট সাপ দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠি। কিন্তু সেদিন কী হবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “তোমাদের মধ্যে কারও যাকাতবিহীন সংরক্ষিত সম্পদ কিয়ামত দিবসে কেশহীন বিষধর সাপে পরিণত হবে। তার মালিক তার থেকে পলায়ন করবে, কিন্তু সাপ তাকে আঘাত করতে থাকবে, যতক্ষণ না তার আঙুলগুলো খাবার হিসেবে সাপের মুখে দেয়।” (বুখারী, আহমদ)
শুধু কি তাই? এর চেয়েও ভয়ংকর শাস্তি রয়েছে। যেমন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামত দিবসে তার সম্পদকে মাথায় টাকপড়া একটি বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। যার চোখের ওপর দুটি কালো বিন্দু থাকবে। কিয়ামতের দিনে তাকে তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সাপটি তার মুখের দুই দিকে কামড়ে ধরবে এবং বলবে; আমিই তোমার ধন-সম্পদ, আমিই তোমার সঞ্চিত সম্পদ।” (বুখারী শরীফ) ধন-সম্পদের যাকাত আদায় না করে সেগুলো কুক্ষিগত, জমা করে, প্রিয় করে রাখা মূলত সাপ জড়িয়ে রাখারই সমতুল্য।
৮. গৃহপালিত পশুর যাকাত না দেওয়ার শাস্তি
এগুলো ধন-সম্পদ জমা রাখা তথা টাকা-পয়সার যাকাত না দেওয়ার পরিণাম। এবার আমি পশু-পাখির যাকাত না দেওয়ার পরিণাম প্রসঙ্গে আসছি। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো উট, গরু, ছাগল বা ভেড়ার যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামত দিবসে সেগুলোকে পূর্বে যেরূপ ছিল, তার চেয়ে অধিক বিরাট ও মোটাতাজা করে আনা হবে। অতঃপর জন্তুগুলো তাদের শিং দ্বারা মালিকদেরকে গুঁতাতে থাকবে এবং খুর দ্বারা আঘাত করতে থাকবে। যখন তাদের দলটি শেষ করবে তখন পুনরায় প্রথম দলটিকে মালিকের ওপর আনা হবে। এভাবে চলতেই থাকবে যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে বিচার ফয়সালা হয়ে যায়।” (বুখারী ও মুসলিম)
উক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যাকাত না দেওয়ার পরিণাম খুবই ভয়ংকর। আর এটা শুধু কবরে নয়; তারপরও হবে। অতএব এই ভয়ংকর শাস্তি থেকে বাঁচতে আসুন আমরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করি। ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামের সুবর্ণ সোনালি যুগে যখন যাকাত ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ হয়েছিল, তখন আরবে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো দরিদ্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। যাকাত ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে সুন্দর সমাজ গঠন করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে যাকাত আদায় ও প্রদান করার তাওফিক দিন (আমিন)।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কামিল/এম.এ; সালনা, গাজীপুর

