১. ছেলেরা টাখনুর উপর ও হাঁটুর নিচে কাপড় পরিধান করবে
ছেলেদের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। এতটুকু ঢেকে রাখা ফরজ। এতটুকু স্থান প্রকাশ করা মানে ফরজ তরক করা। আর ফরজ তরক করলে কবিরা গুনাহ হয়। বালেগ হওয়ার পর থেকে ছেলেদের এই ফরজ মেনে চলতে হয়। না মানলে ফরজ তরককারী হিসেবে কবিরা গুনাহগার হতে হয়।
কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের সতর আবৃত করে এবং যা সৌন্দর্যবর্ধক..." (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ২৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ সতরের অন্তর্ভুক্ত।" (দারাকুতনি, সুনানে বায়হাকি)
সাধারণত ফুটবল খেলোয়াড়রা হাফপ্যান্ট পরে খেলে থাকে, যা প্রথমত নিজের গুনাহ। আবার তার কারণে যারা তার উরু দেখছে তারাও গুনাহগার হয়। অর্থাৎ হাঁটু ঢেকে না রাখলে নিজে তো গুনাহ করেই, আবার অন্যকেও গুনাহগার বানানো হয়। অনেকেই হাফপ্যান্ট পরে বাইক চালায়, যা অন্যায়।
একইভাবে ছেলেদের টাখনুর উপরে কাপড় পরিধান করতে হবে। টাখনুর নিচ পর্যন্ত কাপড় পরিধান করবে মেয়েরা। টাখনুর উপর বলতে হাঁটুর নিচ থেকে টাখনুর উপর পর্যন্ত। টাখনু ও হাঁটুর মাঝামাঝি জায়গাকে 'নিসফে সাক' বা অর্ধেক গোছা বলা হয়।
আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, "লুঙ্গি বা কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নিচে থাকবে, তা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৭৮৭)
আর অহংকার করে যদি কেউ টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করে, তবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে পবিত্র করবেন না, তার দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না। এমন আরো কঠিন শাস্তি রয়েছে তার জন্য।
হাদিসের রেফারেন্স (অহংকারবশত কাপড় ঝোলানো): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তিন ব্যক্তির দিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা (রহমতের) দৃষ্টি দেবেন না... তাদের একজন হলো যে ব্যক্তি (অহংকারবশত) টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০৬)
২. মেয়েরা টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করবে
টাখনুও মেয়েদের সতরের অন্তর্ভুক্ত। মেয়েদের উচিত নয় ছেলেদের মতো টাখনুর উপরে কাপড় পরিধান করা। বর্তমানে মেয়েরা টাখনুর উপরে কাপড় পরিধান করাকে ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
হাদিসের রেফারেন্স: উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নারীদের কাপড়ের ঝুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সা.) বললেন, "তারা এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে।" উম্মে সালামাহ বললেন, "তাহলে তো তাদের পা উন্মুক্ত হয়ে যাবে!" রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, "তাহলে তারা এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪১১৯; সুনানে তিরমিজি)
৩. মেয়েদের চুলও পর্দার অন্তর্ভুক্ত
মেয়েদের চুলও যেহেতু সতরের অন্তর্ভুক্ত, তাই চুল ঢেকে রাখা ফরজ। বর্তমানে অনেক মেয়েকে দেখা যায় তারা চুলে কালার করে, চুল কেটে ছেলেদের মতো করে রাখে, চুলের বিভিন্ন রকম ফ্যাশন করে যা করা শরিয়তে নিষিদ্ধ বা হারাম।
কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "...তারা যেন তাদের জিলবাবের (চাদরের) অংশ নিজেদের ওপর ঝুলিয়ে দেয়..." ( can be linked to wrapping completely) এবং "...তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে টেনে দেয় এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে..." (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)
যে মেয়ে চুল ঢেকে রাখে আর যে ঢেকে রাখে না, তারা কখনোই সমান নয়। যে ঢেকে রাখে সেই শ্রেষ্ঠ (অন্তত এ কাজের তুলনায়)। আর পর্দায় মেয়েদের দেখায় সম্ভ্রান্ত ও স্মার্ট।
হাদিসের রেফারেন্স (পুরুষালি বেশ ধারণে নিষেধাজ্ঞা): ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন সেসব নারীদের যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে এবং সেসব পুরুষদের যারা নারীদের বেশ ধারণ করে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৮৮৫)
৪. কণ্ঠসংগীতকে হ্যাঁ, যন্ত্রসংগীতকে না
সংগীত করতে মিউজিক লাগে না। আল্লাহ আমাদের কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁর নিয়ামত প্রকাশ করে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য। যার গানের গলা রয়েছে, খালি গলায় সে খুব সুন্দর গান বা গজল গাইতে পারে। ইসলাম সুস্থ ও নৈতিক কণ্ঠসংগীতকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে বাদ্যযন্ত্র ও মিউজিককে হারাম করেছে।
কুরআনের ইঙ্গিত: "আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য 'লাহওয়াল হাদিস' (অসার কথা/বাদ্যযন্ত্র-গান) ক্রয় করে..." (সূরা লোকমান, আয়াত: ৬) [অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ির মতে এখানে 'লাহওয়াল হাদিস' বলতে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে এমন কিছু দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৫৯০)
৫. পরপুরুষের সামনে নৃত্য করা হারাম
মেয়েরা অবশ্যই পরপুরুষের সামনে নৃত্য করবে না। নৃত্যের মাধ্যমে মেয়েদের অঙ্গভঙ্গি প্রকাশিত হয়। পুরুষের হৃদয়ে কুমন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, শয়তানও কুমন্ত্রণা দেয়। যেহেতু পরনারী সুপ্ত দৃষ্টিতে দেখাই ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে নৃত্য তো আরো ভয়ংকর। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে পুরুষরা না দেখলেই পারে। হুম, পুরুষরা না দেখলে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাদের মেয়ে নৃত্যশিল্পীরা কি তাই চায়?
কুরআনের নির্দেশ (দৃষ্টির পর্দা): আল্লাহ তাআলা বলেন, "মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে..." এবং "মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে..." (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০-৩১)
নৃত্য হতে পারে একান্তভাবে স্বামীর জন্য, শারীরিক ব্যায়ামের জন্য বা শরীর সুস্থ রাখার জন্য। তবে তা অবশ্যই শরিয়তের সীমার (চার দেয়ালের) মধ্যে থাকতে হবে, যেখানে কোনো পরপুরুষের দৃষ্টি পৌঁছাবে না।
৬. ছেলেরাও নৃত্য করবে না
ছেলেরাও নৃত্য করবে না। নৃত্যের মাধ্যমে তাদের অঙ্গভঙ্গি মেয়েদের মতো হয়ে যায়, যা আল্লাহর সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তনের শামিল। পাশাপাশি তাদের নাচের দ্বারা মেয়েরাও আকৃষ্ট হতে পারে। কারণ নারী ও পুরুষ একে অপরের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। তাই এমন কিছু করা যাবে না যাতে গুনাহ করা সহজ হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ লানত (অভিশাপ) বর্ষণ করুন ওইসব পুরুষদের ওপর যারা নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং ওইসব নারীদের ওপর যারা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করে।" (সহীহ বুখারি)
৭. লজ্জা শুধু নারীর ভূষণ নয়, পুরুষেরও ভূষণ
আমাদের দেশে একটা ভুল কথা প্রচলিত আছে, তা হলো— "লজ্জা নারীর ভূষণ।" আসলে লজ্জা কেবল নারীর নয়, পুরুষেরও ভূষণ। এককথায় লজ্জা মানুষের ভূষণ। লজ্জা না থাকলে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে না। হাদিসে আছে: "লজ্জা ইমানের একটি অন্যতম শাখা।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৯; সহীহ মুসলিম)
ইমানের সত্তরটিরও বেশি শাখাপ্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে লজ্জা একটি অন্যতম শাখা। লজ্জাহীন মানুষ পশুর সমান।
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন তোমার মাঝে লজ্জা থাকবে না, তখন তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৩৪৮৪)
আমাদের উচিত ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এই ইসলামি বিধিবিধানগুলো মেনে চলা; যাতে ইহকালে ও পরকালে আমরা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। তবেই আমাদের মানবজীবন সার্থক হবে।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়, রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর।

