Logo

ধর্ম

যিলহজের প্রথম দশক

ইবাদত ও আমলের বসন্ত

Icon

মাওলানা বুরহানউদ্দীন নদভী

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ২০:০৪

ইবাদত ও আমলের বসন্ত

হিজরি সনের সর্বশেষ মাস যিলহজ। এটি হজ ও কুরবানির মাস। উভয় আমলের রয়েছে স্বতন্ত্র ফজিলত ও বিধান। কুরআন কারিমের সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে চার মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন, যিলহজ তার অন্যতম। এ মাসের ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আশারায়ে যিলহজ তথা যিলহজের প্রথম দশক। কুরআন মাজিদের সূরা ফজরে আল্লাহ তাআলা যে “দশ রজনীর” শপথ করেছেন, সেই দশ হলো যিলহজের প্রথম দশক। হজরত ইবনে আব্বাস রা., হজরত ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রহ.-সহ পূর্ববর্তী-পরবর্তী অনেক মুফাসসির এ মতই ব্যক্ত করেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৩৬০)

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দশকের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন— “আল্লাহর নিকট যিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নয়।” সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয়? তিনি বললেন, “না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়েছে অতঃপর সেখান থেকে আর ফিরে আসেনি (অর্থাৎ তার আমলই এ দশদিনের অন্যান্য নেক আমল থেকে উত্তম হতে পারে)।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৬৯)

এ দশদিনের মাঝে রয়েছে ইয়াওমে আরাফা। অর্থাৎ যিলহজ মাসের নবম তারিখ। এদিন হাজি সাহেবগণ উকুফে আরাফা করেন। হজের মূল দিন হচ্ছে যিলহজের নয় তারিখ। এদিন বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে ধাবিত হয়। হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪৮)

এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল:

ক. যেহেতু আল্লাহ তাআলার কাছে এ দিনগুলোর মর্যাদা অপরিসীম, তাই আমরা এ দিনগুলোতে বেশি বেশি নামাজ, তিলাওয়াত, দুআ-মোনাজাত ও তাসবিহ-জিকিরের প্রতি মনোনিবেশ করব। এ দিন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া মুস্তাহাব। (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ৩৫৪)

প্রখ্যাত তাবেঈ ইকরিমা রহ. বলেন, আইয়ামে তাশরিকের মধ্যে এ দুআটি পড়া মুস্তাহাব— "রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আযাবান্নার।" (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ৩৮৮)

খ. এ দিনগুলোতে আমরা রোজার প্রতি মনোযোগী হব। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যিলহজের নয়টি দিনে রোজা রাখতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৪৩৭)

গ. বিশেষ করে নয় তারিখ ইয়াওমে আরাফার দিন রোজা রাখার চেষ্টা করব। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন— “আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)

ঘ. এ দশকের আরো একটি বিশেষ আমল হলো— যিলহজের চাঁদ ওঠা থেকে নিয়ে কুরবানি করা পর্যন্ত নখ, চুল ও শরীরের অবাঞ্ছিত পশম না কাটা, না ছাঁটা। অতএব যিলহজ আগমনের পূর্বেই নখ-চুল কেটে-ছেঁটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা কুরবানি করবেন তারা তো এর প্রতি যত্নবান হবেনই। আর যারা কুরবানি করবেন না, তারাও এ আমলে শরিক হবেন। এমনকি বাচ্চাদেরকেও অভিভাবকগণ চুল-নখ কাটা থেকে রাখতে পারেন। এতেও ইনশাআল্লাহ সওয়াব হাসিল হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৭৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৭৮৯; সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৪৩৬৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস ৭৫২০; আলমুহাল্লা, ইবনে হাযম ৬/২৮)

ঙ. যিলহজ মাসের নয় তারিখ ফজর থেকে নিয়ে তেরো যিলহজ আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর নারী-পুরুষ সবার জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব।

তাকবিরে তাশরিক হলো— "আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।" (আল-মুহীতুল বুরহানি, ২/১১৯; ফাতহুল কাদির, ২/৮১; রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৮; হিন্দিয়া, ১/১৫২)

লেখক: উস্তাদ, জামিয়া দারুল ইমান, বেগম মসজিদ কমপ্লেক্স, চাঁদপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন