শালী-দুলাভাইয়ের অবাধ মেলামেশা
অনৈতিক সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
মাওলানা সাইফুল ইসলাম সালেহী
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০০:১৮
আমাদের সমাজে শালী ও দুলাভাইয়ের সম্পর্ককে অনেক সময় অত্যন্ত হালকা ও রসাত্মকভাবে দেখা হয়। কিন্তু এই সম্পর্কের আড়ালে যে ধর্মীয় ও সামাজিক অবক্ষয় লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, দুলাভাই শালীর গায়ে হাত তুলছে বা গায়ে পড়া আচরণ করছে। শালী ওয়াশরুমে গেলে দুলাভাই দুষ্টামি করে লাইট বন্ধ করে দিচ্ছে, শালী চিৎকার করলে আবার অনায়াসে লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া শালী-দুলাভাই মিলে একসাথে লুডু খেলা, রিকশায় করে অবাধে ঘুরে বেড়ানো, কিংবা নদীর বুকে নৌকায় বসে সময় কাটানো যেন এক সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় শালী তার দুলাভাইকে গান শোনায়—“মন মাঝি খবরদার, আমার তরী যেন ভেড়ে না, আমার নৌকা যেন ডুবে না, মন মাঝি খবরদার।” শালীর কণ্ঠে এমন গান শুনে দুলাভাই হাততালি দেয় এবং দুজনে মিলে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে।
এখানেই শেষ নয়, শালী-দুলাভাইয়ের এই অবাধ মেলামেশা পার্ক ও রেস্তোরাঁ পর্যন্ত গড়ায়। সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে গল্পগুজব, হাসাহাসি ও নানা রকমের দুষ্টামি। এমনকি দুলাভাই দূরে থাকলে ভিডিও কলেও তাদের নিয়মিত যোগাযোগ চলে। এই ধরনের লাগামহীন মেলামেশার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক দুলাভাই শালীদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় এবং জড়িয়ে পড়ে চরম অশ্লীলতায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুলাভাই তার শ্বশুরবাড়ির আর্থিক খরচ মেটায়, আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শালীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলশ্রুতিতে, শালী ও দুলাভাই উভয়েই এক ভয়ঙ্কর গুনাহ ও অশ্লীলতার সাগরে ডুবে যায়।
শালী-দুলাভাইয়ের এই সব অবৈধ সম্পর্ক সম্পূর্ণ অন্যায় ও নিষিদ্ধ। ইসলামে একে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন: “চোখের ব্যভিচার হলো (অন্যায়ভাবে) দেখা, কানের ব্যভিচার শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার বলা, হাতের ব্যভিচার ধরা, পায়ের ব্যভিচার হাঁটা, মন কামনা করে আর লজ্জাস্থান তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৫৭)
সুতরাং শালী ও দুলাভাই যা কিছু করছে—এই অবাধ মেলামেশা, অহেতুক হাসাহাসি ও দুষ্টামি—তার প্রতিটিই গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তারা মূলত জেনা ও এক ভয়ঙ্কর অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন: “তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হইও না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।” (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত নং: ৩২)
শালীর জন্য দুলাভাই কোনো ‘মাহরাম’ (যাদের বিয়ে করা হারাম) পুরুষ নন। অতএব, দুলাভাইয়ের সামনে শালীকে অবশ্যই পর্দা বজায় রাখতে হবে। পর্দা হলো ইসলামের সৌন্দর্য, যা একজন নারীকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে রক্ষা করে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:) বলেছেন, “নারী পর্দাবৃত থাকার বস্তু। যখন সে পর্দাহীন হয়ে বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে চোখ তুলে তাকায়।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১১৭৩)
পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এই বিষয়ে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে মেয়ের বাবা-মাকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে, যেন তাদের মেয়ে জামাতার (দুলাভাইয়ের) সাথে নির্জনে না মেশে এবং অবাধে চলাফেরা না করে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয় নেমে আসবে।
সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে বিয়ের মাত্র সাত দিনের মাথায় দুলাভাইয়ের সঙ্গে শালী পালিয়ে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, নববধূর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া প্রায় ৩ ভরি সোনাও তারা নিয়ে গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভানোর ইউনিয়নের নেংটিহারা গ্রামে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক ঘটনার মূল কারণ হলো—পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা।
শালী-দুলাভাইয়ের এই অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক রুখতে হলে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে জোরালো বাধা সৃষ্টি করতে হবে। কোনোভাবেই শালীকে দুলাভাইয়ের সাথে একান্তে বা অবাধে মিশতে দেওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন, “প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, তোমরা অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তী হয়ো না।” (সূরা আন’আম, আয়াত নং: ১৫১)
সর্বোপরি, শালী ও দুলাভাই উভয়কেই অন্তর থেকে আল্লাহকে ভয় করতে হবে। অন্তরে যদি আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকে, তবে এই ধরনের অন্যায় ও কুচিন্তা মনের ভেতর আসতেই পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” (সূরা তাগাবুন, আয়াত নং: ১৬)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।” (সূরা আন-নুর, আয়াত নং: ৩০)
আসুন, আমরা আমাদের পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি করি এবং পর্দা ও লোকলজ্জার বিধান মেনে চলে সমাজকে এই ধরনের ভয়ঙ্কর অপরাধ থেকে মুক্ত রাখি।
লেখক: আলেম ও গবেষক।

