Logo

ধর্ম

বাঙালি মানসে কবি ফররুখ আহমদ

Icon

হাসান মাহমুদ

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০০:২৪

বাঙালি মানসে কবি ফররুখ আহমদ

​তিরিশের কবিরা বাংলা কবিতায় নতুন এক মাত্রার সংযোজন করেছিলেন। তাঁরা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রোত্তর এক নতুন জগতের সন্ধান এবং তাঁদের সৃষ্টিতে এনেছিলেন কাব্যিক জোয়ার। তিরিশের এই সম্প্রসারিত কাজকে যিনি সদর্পে ও সগৌরবে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন; তিনি হলেন বাঙালির জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ। আধুনিক কবিতায় ফররুখ আহমদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি মূলত বাঙালি মুসলমানদের রেনেসাঁর কবি এবং তাঁর কাব্যিক জাগরণ আজও পাঠকের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়।

​কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ই জুন তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার অন্তর্গত মাঝআইল গ্রামের এক বিখ্যাত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতা বেগম রওশন আখতার। দুর্ভাগ্যবশত, কৈশোরেই তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। কবি ফররুখ আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাল্যকালে গ্রামের পাঠশালাতে। পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় এসে তালতলা মডেল এম. ই. স্কুলে ভর্তি হন। এরপর কলকাতার বিখ্যাত বালিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। সে সময় কবি গোলাম মোস্তফা বালিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর ছাত্র ফররুখ আহমদের কবিত্ব বিকাশে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি খুলনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৯ সালে তিনি কলকাতা রিপন কলেজ থেকে আই. এ পাস করেন। এরপর কীর্তিমান এই কবি কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজ ও সিটি কলেজেও পড়াশোনা করেন। আই. এ পাস করার পর প্রথমে তিনি দর্শন ও পরে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বি. এতে ভর্তি হন। ইংরেজি সাহিত্যেও কবি ফররুখের গভীর বিচরণ ছিল।

​বিভাগপূর্ব বাংলাসাহিত্যের রাজধানী কলকাতায় তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হয়। সমকালীন অন্যান্য কবি-লেখকদের চেয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন স্পষ্টত দুটি অংশে বিভক্ত। তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রথম অংশ শুরু হয় কলকাতায় এবং দ্বিতীয় অংশ অতিবাহিত হয় ঢাকায়। প্রথমাংশ ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৮ কালপর্যায় এবং দ্বিতীয় অংশ ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। কলকাতা জীবনে কবি ফররুখ আহমদ নানারকম চাকরি করেন, আর ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে যুক্ত হন রেডিওর সাথে।

​প্রথম জীবনে কবি ফররুখ আহমদ অল্প কয়েকটি গল্প লিখেও পাঠকমহলে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। গল্প-কবিতা, গদ্য-প্রবন্ধ প্রায় টানা চার দশক অবিশ্রান্তভাবে লিখে গেছেন তিনি। বিশেষ করে কবিতা লেখায় তাঁর কখনো ছেদ পড়েনি। শিশু-কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন অজস্র ছড়া ও কবিতা। পাশাপাশি, কবি ফররুখ তৎকালে তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গকবিতার জন্য দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং বাঙালির মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তিনি প্রায় চৌদ্দটি ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর জীবদ্দশায় ছয়টি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত বেশ কয়েকটি কবিতা সংগ্রহ বের হয়। এর মানে আজও কবি ফররুখ আহমদের বিপুল সাহিত্যসম্ভার পুরোপুরি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়নি।

​কবি ফররুখ আহমদের কাব্যরীতির মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো ধ্রুপদ (ক্লাসিক) ও রোমান্টিকতার এক অপূর্ব সাযুজ্য ছিল। চল্লিশের দশকের কবিতার সাধারণ সময়স্বভাবকে ধারণ করেও তাঁর সৃষ্টি অন্য এক উচ্চতায় উত্তীর্ণ হয়। অনেক সময় এমন হয়েছে যে, সাময়িক বিষয়ের ওপর লিখেও তিনি কবিতায় সময়োত্তর বা কালজয়ী হয়ে উঠেছেন।

​পঞ্চাশের দশকের কবি হাসান হাফিজুর রহমান একবার অতি-আত্মকেন্দ্রিকতা পীড়িত কবিতার বিরোধী স্রোতের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আধুনিক সাহিত্যের বিন্যাসে যদি ব্যক্তিকতা একটি প্রধান নিয়ামক শক্তি হয়ে থাকে, তাহলে নৈর্ব্যক্তিকতা তথা অনাত্মতাও তার প্রতিবিন্যাসে নিরন্তর উপস্থিত। এই তথ্যটি অত্যন্ত স্মরণীয়। বস্তুত কবিতা তথা সাহিত্য যদি শেষ পর্যন্ত আত্মগতের ঊর্ধ্বে না ওঠে, তাহলে তা প্রকাশের সার্থকতা থাকে না; ব্যক্তিক কবিতা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেও ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।

​আধুনিক কবিতাকে মূলত দুভাগে ভাগ করা যায়—যার একটি অংশ আত্মকেন্দ্রিক এবং অপরটি অনাত্মকেন্দ্রিক। কবি ফররুখ আহমদ মূলত অনাত্মকেন্দ্রিক কবি-সংঘের একজন অগ্রগণ্য পুরুষ ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক কবিতা থেকে শুরু করে উপান্ত্য কবিতা অবধি নৈর্ব্যক্তিক কবিসত্তার বিচিত্র ও ক্রমিক উৎসারণ আমরা দেখতে পাই। কবি ফররুখ আহমদের মূল লক্ষ্য ব্যক্তি নয়; বরং জাতি, সমাজ ও কালকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ছিল। কবি ফররুখ আহমদ বাংলাসাহিত্যের মধ্যে রেনেসাঁস বা জাগরণকে কবিতার উপমায় ও উৎপ্রেক্ষায় যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন, তা তাঁর সময়কালে অন্য কেউ পারেননি। কবি ফররুখ আহমদ বাঙালি মনে ও মননে পূর্বেও ছিলেন, বর্তমানেও আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন আরও বহুকাল।

লেখক: আলেম, কবি, গবেষক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন