Logo

ধর্ম

ত্যাগের শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

ঈদুল আজহা ও বৈষম্যহীন সমাজ

Icon

মুফতি কামরুল বিন আইয়ুব

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২:৫৮

ঈদুল আজহা ও বৈষম্যহীন সমাজ

ভূমিকা: ইসলামের প্রতিটি উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। হিজরি সনের জিলহজ মাসে উদযাপিত পবিত্র ঈদুল আজহা এর একটি বড় প্রমাণ। কোরবানি কেবল একটা লোকদেখানো নিয়ম বা পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভেতরের অহংকার, স্বার্থপরতা ও পশুবৃত্তিকে কোরবানি দেওয়া। ইসলামের আসল সৌন্দর্য হলো, ঈদের এই আনন্দ কখনোই একা একা উপভোগ করার জন্য নয়; বরং সমাজের গরিব-দুঃখী ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমেই এই ঈদের আসল সার্থকতা লুকিয়ে আছে।

কোরবানির মূল চেতনা ও সাম্যবাদ:

ঈদুল আজহার মূল বাণীই হলো আত্মত্যাগ ও আল্লাহভীতি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতিকে স্মরণ করেই আমরা প্রতি বছর কোরবানি দিয়ে থাকি। ঈদের দিন সকালে আমির-ফকির, ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই একসঙ্গে একই ঈদগাহে এসে কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করেন। নামাজের পর কোলাকুলির মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সব হিংসা ও দূরত্ব দূর হয়ে যায়। ইসলাম আমাদের পরিষ্কারভাবে শেখায় যে, আল্লাহর দরবারে মানুষের টাকা-পয়সা বা দামি পোশাকের কোনো মূল্য নেই, সেখানে মানুষের মনের নিয়ত ও পবিত্রতাই আসল। কুরআনে বলা হয়েছে, "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওগুলোর মাংস এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৭)।

সামাজিক সম্প্রীতি ও মাংস বণ্টন:

ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় সামাজিক উপকার হলো এর মাংস বণ্টনের নিয়ম। কোরবানি করা পশুর মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করার নিয়ম আমাদের সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। এর এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয় ও প্রতিবেশীর জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজের গরিব ও অভাবী মানুষের জন্য রাখা হয়। এই নিয়মের কারণে সমাজের যে মানুষটি হয়তো আর্থিক কষ্টের জন্য সারা বছর ভালো মাংস কিনে খেতে পারে না, সেও ঈদের দিন পেট পুরে খেতে পারে। এই আদান-প্রদান ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব দূর করে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে দারুণ ভূমিকা রাখে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা নিজেরা খাও, সংরক্ষণ করো এবং দান করো।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৭১)।

চামড়ার হক ও দরিদ্রের কল্যাণ:

মাংসের পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়ারও একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ইসলামে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা হলে, তার পুরো অর্থ গরিব, এতিম ও নিঃস্ব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই অর্থ দিয়ে দেশের হাজার হাজার এতিমখানা ও মাদ্রাসার অসহায় শিশুদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়। তাই চামড়ার সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং তা দ্রুত এতিমদের হাতে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। এর মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অসহায় অংশটি বড় ধরনের একটি আর্থিক সহায়তা পায়, যা সমাজে অর্থনৈতিক সমতা আনতে সাহায্য করে।

মানবতাবোধ ও পরিবেশ সচেতনতা:

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা আমাদের সবসময় চারপাশ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদ দেয়। কোরবানি করার পর পশুর বর্জ্য বা রক্ত যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা ইসলামী শিষ্টাচারের পরিপন্থী। কোরবানি শেষে দ্রুত বর্জ্য মাটির নিচে পুঁতে ফেলা, রক্ত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা এবং চারপাশ ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখা আমাদের নাগরিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মহানবী (সা.) বলেছেন, "পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধাংশ।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৩)। আমাদের আনন্দের কারণে যেন কোনো প্রতিবেশী বা পথচারী দুর্গন্ধ বা নোংরা পরিবেশের কষ্টে না পড়েন, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকাই আসল ইসলামী আদর্শ।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উদারতা:

ইসলামের উৎসবের আনন্দ কেবল মুসলিমদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো মানবজাতির জন্য। সমাজে আমাদের যেসব অমুসলিম প্রতিবেশী বা বন্ধুরা আছেন, তাদের সাথেও ঈদের আনন্দ এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করা উচিত। প্রতিবেশীর জন্য নির্ধারিত মাংসের অংশ থেকে অমুসলিম প্রতিবেশীদেরও দেওয়া যায়। ইসলাম অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সবসময় সদয় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। কুরআনে বলা হয়েছে, "ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।" (সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)।

উপসংহার:

ঈদুল আজহা আমাদের শেখায় নিজের স্বার্থের কথা ভুলে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সমাজের প্রতিটি ঘরে খুশির আলো জ্বলবে। শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, কোরবানির মূল ত্যাগ ও চেতনাকে আমাদের বাস্তব জীবনে ধারণ করতে হবে। আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ত্যাগের মহিমায় এবারের ঈদুল আজহাকে সবার জন্য আনন্দময় ও বৈষম্যহীন করে তুলি।

লেখক: ইসলামী গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন