কোরবানী ইসলামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবলই পশু জবাই করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মহান আল্লাহর প্রতি নিখাদ আনুগত্য, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর কোরবানী করা ওয়াজিব হয়। তবে সব মুসলমানের ওপর কোরবানী আবশ্যক নয়। ইসলামে কোরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট আর্থিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে শরিয়তের পরিভাষায় “নেসাব” বলা হয়।
নেসাব কী
শরিয়তের পরিভাষায় 'নেসাব' হলো— সম্পদের এমন একটি নির্ধারিত পরিমাণ, যার মালিক হলে কোনো ব্যক্তির ওপর নির্দিষ্ট একটি আর্থিক ইবাদত বা বিধান আবশ্যক (ওয়াজিব/ফরজ) হয়। যেমন— যাকাতের জন্য একটি নির্দিষ্ট নেসাব আছে, ঠিক তেমনি কোরবানীর জন্যও একটি সুনির্দিষ্ট নেসাব রয়েছে।
কোরবানীর নেসাবের পরিমাণ
জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি নিম্নোক্ত পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব হবে:
সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি/তোলা স্বর্ণ; অথবা
সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি/তোলা রৌপ্য; অথবা
এর যেকোনো একটির সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসায়ী পণ্য কিংবা জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোনো সম্পদ।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: কোরবানীর নেসাব পূর্ণ হওয়ার জন্য এই সম্পদটি অবশ্যই ব্যক্তির নিত্যদিনের মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। ঈদের তিন দিনের যেকোনো দিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকা।
কোন কোন সম্পদ নেসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে
নেসাব হিসাব করার সময় একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে-
নগদ টাকা ও ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ।
সঞ্চয়পত্র, শেয়ার বা যেকোনো ব্যবসায়িক বিনিয়োগ।
স্বর্ণ ও রৌপ্য (অলঙ্কার বা খণ্ড আকারে যা-ই থাকুক)।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রাখা জমির প্লট, ফ্ল্যাট বা পণ্যসামজ্ঞী।
মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, ঘর, আসবাবপত্র বা অতিরিক্ত যানবাহন (যা জীবিকা নির্বাহ বা বসবাসের জন্য প্রয়োজন হয় না)।
কোন কোন সম্পদ নেসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়
মানুষের জীবনধারণের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বা মৌলিক সম্পদগুলো নেসাবের পরিধির বাইরে থাকবে। যেমন: বসবাসের মূল বাড়ি বা ফ্ল্যাট।
দৈনন্দিন ব্যবহারের আসবাবপত্র ও পোশাক-আশাক।
যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত নিজস্ব যানবাহন।
পড়াশোনার বইপুস্তক ও পেশাগত কাজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা টুলস।
কোরবানীর নেসাব ও যাকাতের নেসাবের পার্থক্য
অনেকের মাঝেই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যাকাতের মতো কোরবানীর সম্পদও এক বছর মালিকানায় থাকতে হয়। কিন্তু ইসলামি ফিকহের আলোকে এই দুটি ইবাদতের নেসাবের মধ্যে স্পষ্ট কিছু পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, সময়ের পার্থক্য: যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ টানা এক বছর নিজের মালিকানায় থাকা শর্ত। কিন্তু কোরবানীর ক্ষেত্রে পুরো বছর সম্পদ থাকা শর্ত নয়; বরং জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ—এই তিন দিনের যেকোনো সময় নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, সম্পদের ধরণের পার্থক্য: যাকাত কেবল বর্ধনশীল সম্পদের ওপর প্রযোজ্য হয়; যেমন নগদ টাকা, স্বর্ণ-রৌপ্য বা ব্যবসার পণ্য। কিন্তু কোরবানীর নেসাব হিসাব করার সময় বর্ধনশীল হওয়া শর্ত নয়। সোনা-রূপা বা নগদ টাকা ছাড়াও যদি কারও কাছে ব্যবহারিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, ঘর, আসবাবপত্র কিংবা অতিরিক্ত কোনো সামগ্রী থাকে, তবে সেটির মূল্যও কোরবানীর নেসাবে যুক্ত হবে।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী না করার পরিণতি
যার ওপর কোরবানী ওয়াজিব, তার জন্য কোরবানী বর্জন করা মারাত্মক গুনাহের কাজ। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন: “যার কোরবানী করার সামর্থ্য রয়েছে, অথচ সে কোরবানী করলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” — (সুনান ইবনে মাজাহ: ৩১২৩) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানী করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা কতটা অন্যায়।
উপসংহার
কোরবানী ইসলামের অন্যতম একটি শিআর বা মহান নিদর্শন। যাদের মহান আল্লাহ আর্থিক সামর্থ্য দিয়েছেন, তাদের উচিত কোনো প্রকার কৃপণতা বা লোকদেখানো মানসিকতা ছাড়া সম্পূর্ণ ইখলাসের সাথে এই ইবাদত সম্পন্ন করা। কোরবানীর নেসাব নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে সামর্থ্যবানদের চিহ্নিত করা, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা এবং ধনী-দরিদ্রের মাঝে ত্যাগ, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ নিয়তে এবং সঠিক বিধান মেনে কোরবানী করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: ইমাম ও খতিব, টোটালিয়াপাড়া জামে সমজিদ, সাভার, ঢাকা

