ধর্মীয় ধারা ও কওমী মাদরাসা
সংকট, বিভক্তি ও নৈতিক পতনের প্রতিচ্ছবি
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১৩:০২
ধর্মীয় ধারা, বিশেষ করে কওমী মাদরাসাভিত্তিক সংগঠনগুলো সংখ্যায় অনেক হলেও তাদের অনেকের স্থায়িত্ব দীর্ঘ হয় না; বরং অকাল বিভক্তি ও অপমৃত্যুর শিকার হয়। ঐক্য, ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাকের নামে নানা সংগঠন গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বিভেদ সৃষ্টি করে, খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় এবং নতুন নতুন দলের জন্ম দেয়। অথচ একই সময়ে তারা সেকুলার ও জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে।
অযোগ্য নেতৃত্ব ও পদলোভের সংস্কৃতি
আজ এক ধরনের অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—যেখানে সিনিয়র ও যোগ্যদের পাশ কাটিয়ে জুনিয়র ও অযোগ্যরা সামনে আসার চেষ্টা করছে। সংগঠনের প্রকৃত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা না থাকলেও বয়স, বড় মাদরাসার পরিচয় কিংবা সম্পর্কের জোরে তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করছে। এরপর সেই পদকে ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা নিজ প্রতিষ্ঠানের সুবিধা আদায়ের জন্য।
অনেকে অতীতে আওয়ামী লীগের পেছনে ঘুরেছে, এখন আবার জাতীয়তাবাদী শক্তি তথা বিএনপির আশেপাশে ঘুরছে। বিনিময়ে তারা সামান্য সুবিধা পেলেই সন্তুষ্ট। দীনি কোনো বৃহত্তর স্বার্থ না থাকলেও তারা মনে করে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হলেই তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে।
“কওমী জননী” থেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ
একদল মানুষ “কওমী জননী” উপাধি দিয়ে সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে কওমী মাদরাসার স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এখন আবার নতুন রাজনৈতিক শক্তির ছায়ায় সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সমাজের তথাকথিত চিন্তাশীল লেখক বা বুদ্ধিজীবীদের একাংশও ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিকটবর্তী হতে চান। অথচ সেই শাসকরাই কওমী ধারাকে বিভক্ত করেছে, একদলকে লাল দালানের ভাত খাইয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অপমানিত করেছে। এগুলো তিক্ত হলেও বাস্তব সত্য।
খোলস বদলের রাজনীতি
জুলাই বিপ্লবের পর যারা দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী ধারার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, তারাই আজ হঠাৎ খোলস বদলে জাতীয়তাবাদী শক্তির আশ্রয়ে যাচ্ছে। তাদের ঘিরে চলছে নতুন অর্থায়ন ও রাজনৈতিক টানাটানি। আগামী উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও হুজুর শ্রেণিকে ব্যবহার করা হবে। অতীতেও অনেকে ব্যবহৃত হয়েছেন; ব্যবহারের পর টিস্যুর মতো ছুড়ে ফেলা হয়েছে। এখন তারা আবার নতুন ব্যবহারের অপেক্ষায়।
কেন জনতা ভোট দেয় না?
বাংলাদেশে হাজার হাজার মাদরাসা ও লাখ লাখ মসজিদ থাকা সত্ত্বেও কওমীপন্থী বা দেওবন্দি আলেমদের প্রতি সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক আস্থা তৈরি হয়নি। মানুষ দেখেছে—এই শক্তি কখনো সেকুলারদের পেছনে, কখনো জাতীয়তাবাদীদের পেছনে ঘুরে বেড়ায়; তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা দুর্বল। অন্যদিকে যাদের “বাতিল” বা “মওদুদীবাদ” বলা হয়, তারাই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পেয়েছে। কারণ জনগণ অন্তত তাদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দেখতে পায়।
দরবারী বনাম রব্বানী আলেম
নির্বাচনী রাজনীতিতে এই হুজুর শ্রেণিকে কাছে রাখতে হয়, কারণ তারা চাইলে জনসমাবেশের মাধ্যমে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। তাই নানা এজেন্সি ও রাজনৈতিক শক্তি অল্প পয়সায় তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। আজ পোশাক, টুপি ও পাগড়ি অটুট থাকলেও আত্মমর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে বিকিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা ক্ষমতাসীনদের নৈকট্যকে “হেকমত” নামে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। অথচ হক্কানী ও রব্বানী আলেমদের ঐতিহ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যারা খাম, লুঙ্গি, কম্বল কিংবা সামান্য টাকার বিনিময়ে নিজেদের বিক্রি করে দেন, তারা হক্কানী আলেমদের উত্তরসূরি হতে পারেন না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—দরবারীরা যুগে যুগে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু রব্বানী আলেমরা সম্মানিত ও স্মরণীয় হয়ে থেকেছেন।
কওমী অঙ্গনের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়
কিছু বক্তা বিয়ে-শাদি ও ওয়াজকে তামাশায় পরিণত করেছেন। এর ফলে নারী সমাজ ও শিক্ষিত শ্রেণির কাছে আলেমদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অথচ কওমী কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। অনেকে আরও বেশি দরবারী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন—কে আগে ক্ষমতাবানদের কাছে পৌঁছাতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা।
আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের স্মরণ
আমি সৌভাগ্যবান যে দেওবন্দি ধারার কিছু গায়রতমন্দ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আলেমের সান্নিধ্য পেয়েছি। তাদের জীবন, আত্মমর্যাদা ও গায়রত আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
আমি বিশ্বাস করি, আলেমদের একাংশ সবসময় দরবারী হবে, আর একাংশ রব্বানী থাকবে। দরবারীদের দেখে আমি হতাশ নই; তবে কষ্ট পাই। কারণ যাদের নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতাম, যাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে গর্ব করতাম, তাদের একাংশ আজ সামান্য স্বার্থে নিজেদের বিক্রি করে দিচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের সংকট
৮০-৯০ দশকের পর ব্যক্তিত্বহীন এক শ্রেণির মৌলভি ও মুন্সির উত্থান ঘটেছে। তারা পাকিস্তান আমলের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন গায়রতমন্দ আলেমদের ইতিহাস ও সংগ্রাম সম্পর্কে অজ্ঞ। যদি তারা সেই জীবনী পড়ত, তবে এত অল্প মূল্যে নিজেদের বিক্রি করত না। আল্লাহ আপনাকে ইলম দিয়েছেন, কুরআন দিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন—আপনি আপনার মর্যাদা রক্ষা করুন। কিন্তু এক শ্রেণির স্বার্থবাদী ও অপরিণামদর্শী লোক নিজেদের স্বার্থে আমাদের বুজুর্গদের ঐতিহ্যকেও বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে মেধাবী তরুণ সমাজ হতাশ হয়ে পড়ছে।
সত্য কথার মূল্য
আজকের এই তেতো কথাগুলোর জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু সত্য না বললে দায়মুক্তি নেই। এই সমাজে আজ টাকার মালিক ও শাসকের ঘনিষ্ঠরাই বেশি সম্মান পায়; যারা কিতাবপত্র, গবেষণা এবং মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায় তারা আজ সাময়িকভাবে অবহেলিত। এখন চলছে নিজেকে বিক্রির প্রতিযোগিতা। পদ-পদবি যেন গরুর বাজারে দামের মতো মর্যাদা নির্ধারণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের প্রত্যাশা
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রব্বানী, হক্কানী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের সান্নিধ্যে থাকার তাওফিক দিন। যারা শিক্ষকতা করি, আমাদেরকে প্রকৃত আলেম তৈরির তাওফিক দিন। শুধু পাগড়ি পরানো নয়; বরং গুণগত মানসম্পন্ন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সাহসী আলেম গড়ে তোলার তাওফিক দিন।
খেলাফতে রাশেদার যুগ থেকে আজ পর্যন্ত রব্বানী আলেম ছিলেন, আছেন, থাকবেন ইনশাআল্লাহ। আর যারা শাসকদের দুর্নীতি, অন্যায় ও চাঁদাবাজির সহযোগী হবে—তারা নানা “হেকমতের” গল্প বললেও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
সময়ের জীবন্ত আকাবিরদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। অযোগ্য, অথর্ব ও অপদার্থদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি—যারা অল্প স্বার্থে আকাবিরদের ইজ্জত ও ঐতিহ্য বিক্রি করে দেয়।
সময় বদলেছে। অনেক জুনিয়র আজ মনে করে মুরব্বিদের প্রজ্ঞা কম। তাই তারা নানা কৌশলে তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। তবুও সত্য কথা বলতে হবে, বলে যেতে হবে।
আমরা আল্লাহর দরবারে ইলম ও ঈমান হেফাজতের তাওফিক কামনা করি।
দেওবন্দ সারবুলন্দ। মর্যাদায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকুক এবং সসম্মানে টিকে থাকুক কওমী ও দেওবন্দি ধারা।
লেখক: আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ

