Logo

ধর্ম

ফাতওয়ায়ে তাতারখানী

নারগাঁয়ের শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী আইনের এক বিরল সংকলন

Icon

লাবীব আবদুল্লাহ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১৩:২০

নারগাঁয়ের শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী আইনের এক বিরল সংকলন

​যুগে যুগে ইসলামী আইন সংকলিত ও সুবিন্যস্ত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিকহ ও ফতোয়ার অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। উপমহাদেশে ইসলামী আইনের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি সংকলন হলো আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী) এবং আল-ফাতাওয়া আত-তাতারখানিয়া (ফাতওয়ায়ে তাতারখানী)।

​আধুনিক যুগেও প্রাচীন ও সমকালীন ধর্মীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তবে আমাদের অতীতের গৌরবময় ইতিহাসে এমন কিছু সংকলন রয়েছে, যেগুলো শুধু ফিকহশাস্ত্র নয়, বরং মুসলিম শাসকদের জ্ঞানপ্রীতি ও ইসলামী আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধারও উজ্জ্বল নিদর্শন। তেমনই একটি অনন্য সংকলন হলো ফাতওয়ায়ে তাতারখানী, যা বাংলা মুলুকের সোনারগাঁয়ের শাসক তাতার খানের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তাতার খানের পরিচয়

​তাতার খান, যিনি বাহরাম খান নামেও পরিচিত ছিলেন, দিল্লির তুঘলক সালতানাতের একজন শক্তিশালী সেনাপতি ও গভর্নর ছিলেন। তিনি লক্ষ্ণৌতির শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহকে পরাজিত করেন। ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিজয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাকে “খান-ই-আজম বাহরাম খান” উপাধিতে ভূষিত করেন এবং বাংলা মুলুকের সোনারগাঁয়ের গভর্নর নিযুক্ত করেন।

​তিনি ছিলেন এক দক্ষ সিপাহসালার ও বিচক্ষণ শাসক। ১৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁয়েই তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হয় ফাতওয়ায়ে তাতারখানী এবং তাফসিরে তাতারখানী—যা তাঁর জ্ঞানপ্রীতি ও ইসলামী শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতার প্রমাণ বহন করে।

সংকলক: ইবনুল আলা আন্দারপতি

​সে যুগের প্রখ্যাত ফকীহ ও গবেষক আল্লামা আলম বিন আলা আনসারী আন্দারপতি এই বিশাল ফিকহসংকলন রচনা করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন লাইব্রেরিতে আজও এ কিতাবের বহু মাখতুতাত (পাণ্ডুলিপি) সংরক্ষিত রয়েছে।

​হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এতে প্রায় ৩৩ হাজার ৭৭৮টি বিধান সংকলিত হয়েছে। ভারতের প্রখ্যাত আলেম মুফতি শাব্বির আহমদ কাসেমী এ কিতাবকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে প্রায় দশ হাজার উদ্ধৃতি ও দলিল সংযোজন করেছেন। বৈরুত থেকে প্রকাশিত সংস্করণটি ২৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে, যার মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ১৪,৩০০। আবার কোনো কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এটি ২০ খণ্ডেও প্রকাশ করেছে। কিতাবটির ভাষা আরবি। সংকলক ইবনুল আলা আল-আনসারী আল-আন্দারপতি ইসলামী আইনের প্রায় ৩০টি নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে বিধি-বিধান সংগ্রহ করেছেন। এ কিতাবটি 'যাদুল মুসাফির' এবং 'যাদুস সফর' নামেও পরিচিত।

ফাতওয়ায়ে আলমগীরীর সঙ্গে সম্পর্ক

​ফাতওয়ায়ে আলমগীরী বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া পরবর্তীকালে সংকলিত হয় এবং এতে ফাতওয়ায়ে তাতারখানী থেকে বহু বিধান গ্রহণ করা হয়েছে। ফাতওয়ায়ে তাতারখানী সংকলিত হয় ৭৭৭ হিজরি মোতাবেক ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে। এর সংকলক ইন্তেকাল করেন ৭৮৬ হিজরিতে। অন্যদিকে ফাতওয়ায়ে আলমগীরী সংকলিত হয় ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, ফাতওয়ায়ে তাতারখানী উপমহাদেশের ইসলামী আইনচর্চায় কত গভীর প্রভাব রেখেছে।

আমাদের ইতিহাসের গৌরব

​আমাদের অতীত ইতিহাস ছিল জ্ঞান, সভ্যতা ও ইসলামী আইনের মর্যাদায় সমুজ্জ্বল। সোনারগাঁয়ের শাসক তাতার খানের উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ফাতওয়ায়ে তাতারখানী সেই গৌরবেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আজ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু দেশে মানব রচিত আইনের বিস্তার ঘটলেও ইসলামী আইনচর্চা ও তার সংরক্ষণে শাসকদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্মরণ করে, যারা জ্ঞান, ন্যায় ও ইসলামী আইনকে সম্মান করেছে। ইসলামী সভ্যতার সোনালি অধ্যায়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জ্ঞানপ্রীতি ও দ্বীনের খেদমতই মানুষের নামকে ইতিহাসে অমর করে রাখে।

লেখক: আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন